পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সহিংসতা। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও প্রভাব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। গত প্রায় দেড় মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চারজন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। অথচ এতোগুলো হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাম সংগঠন কিংবা সুশীল সমাজ কোন ধরনের প্রতিক্রিয়াও দেখায়নি। শোক দিবস কিংবা অবরোধ কিছুই হয়নি। কিন্তু কেন?
বিশেষ করে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সংগঠনগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব এই সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পাহাড়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
২ মাসে ৪ হত্যাঃ
গত ২ মাসে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে চারটি পৃথক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহতরা সবাই আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের সদস্য বা সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ২৭ মার্চ খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার সুতাকর্মপাড়া এলাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের তপনজ্যোতি চাকমার নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক অংশের উপজেলা সংগঠক নীতিদত্ত চাকমা (৪৫)। স্থানীয় সূত্র জানায়, তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। এরপর ৮ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার আকবাড়ি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের প্রসীত খীসা নেতৃত্বাধীন অংশের সদস্য নিউটন চাকমা (৪৭)।
৭ মে পানছড়ি উপজেলার ইসলামপুর এলাকায় হত্যার শিকার হন তপনজ্যোতি চাকমা নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক অংশের সহযোগী সদস্য মো. ইমন হোসেন (২৫)। তিনি বাঙালি যুবক হলেও আঞ্চলিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। সবশেষ ৯ মে খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের শুকনাছড়া এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন প্রসীত খীসা নেতৃত্বাধীন অংশের সদস্য হেগার চাকমা (৫০)।
এই চারটি হত্যাকাণ্ডে প্রসীত খীসা নেতৃত্বাধীন অংশের দুইজন এবং তপনজ্যোতি চাকমা নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক অংশের দুইজন সদস্য নিহত হয়েছেন। যদিও প্রতিটি ঘটনার পর প্রতিপক্ষ সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে, তবে প্রকাশ্যে কোনো সংগঠন দায় স্বীকার করেনি।
আতঙ্কে সাধারণ মানুষঃ
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জন্য এই সহিংসতা এখন এক নিত্য বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। প্রায়ই গভীর রাতে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। কোথাও রাস্তায় পড়ে থাকে রক্তাক্ত মরদেহ, কোথাও আবার জঙ্গলের ভেতরে পাওয়া যায় লাশ। অনেক সময় নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু এসব ঘটনার বিচার বা প্রকৃত কারণ অনেক সময় অজানাই থেকে যায়। স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর শক্ত ঘাঁটির কারণে অনেক অপরাধের তদন্তও জটিল হয়ে পড়ে। এদিকে বাবাকে হারিয়ে অসহত্ব প্রকাশ করেন সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হেগার চাকমার পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নিহত হেগার চাকমার ছেলে লেপ্তা চাকমা বলেন, বাবার মৃত্যুতে তাদের পরিবার একেবারে ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের পরিবারের ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে গেছে। আমরা এখন অনেক অসহায় হয়ে পড়েছি।” তার এই বক্তব্য পাহাড়ের সহিংস বাস্তবতার আরেকটি দিক তুলে ধরে—যেখানে একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, বরং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তোলে।
চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইঃ
পাহাড়ে সক্রিয় বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, অপহরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার চেষ্টা। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, এমনকি সাধারণ মানুষকেও অনেক সময় এসব সংগঠনের চাঁদার চাপে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দিলে অপহরণ বা হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে অতীতে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণই অনেক সময় সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা ও বাজারকে কেন্দ্র করে কার প্রভাব থাকবে এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
সমাজকর্মীদের উদ্বেগঃ
খাগড়াছড়ির সমাজকর্মীরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক। পাহাড়ে চলমান হত্যাকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে। পাহাড়ের সব সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
সহিংসতার আশঙ্কা আরও বাড়ছেঃ
আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। একটি হত্যাকাণ্ডের জেরে প্রতিশোধমূলক আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটার সম্ভাবনাও থাকে। ফলে পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
মামলা হলেও গ্রেপ্তার নেইঃ
সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এতে অন্তত অর্ধশত আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আরও ১ টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ের দুর্গম পরিবেশ ও সংগঠনগুলোর বিচ্ছিন্ন অবস্থানের কারণে অভিযান পরিচালনায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাহাড়ে অনেক সময় সশস্ত্র সংগঠনের সদস্য নিহত হলেও তাদের স্বজনরা মামলা করতে চান না। ফলে অনেক ঘটনায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভয়ের কারণেই অনেক পরিবার প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না বলেও ধারণা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভক্তি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সহিংসতা। একই সংগঠনের মধ্যেও বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি হওয়ায় সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। নতুন সদস্য সংগ্রহ, এলাকা দখল এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা এই সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলছে। পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে সাজেকসহ পর্যটন এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সড়কে সহিংসতার ঘটনা ঘটলে পর্যটন শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শান্তির প্রত্যাশাঃ
দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত ও সহিংসতার ইতিহাস বহন করে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এই সহিংসতার অবসান হোক এবং পাহাড়ে ফিরে আসুক স্থায়ী শান্তি।
স্থানীয়রা মনে করেন, প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ, রাজনৈতিক সমাধান এবং সকল সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহাবস্থানের মাধ্যমেই পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।


















