ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অস্থির হয়ে উঠতে পারে জ¦ালানি তেলের বৈশি^ক বাজার। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং সিঙ্গাপুর, কোরিয়া থেকে জ¦ালানি তেল আমদানি করে; ভেনেজুয়েলা থেকে আমদানি করে না। তবে খাতসংশ্লিষ্ট এবং জ¦ালানি তেল আমদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, ভেনেজুয়েলা বিশে^র সবচেয়ে বেশি মজুদ তেলের দেশগুলোর অন্যতম। এখন কোনো কারণে যদি ভেনেজুয়েলা থেকে জ¦ালানি তেল আমদানিকারক দেশগুলো এশিয়ার বাজার থেকে জ¦ালানি তেল কিনতে চায়, তবে অবশ্যই বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের জন্য সংকট তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের (ইআইএ) হিসাবে, ভেনেজুয়েলার কাছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার রয়েছে, যা ইরাকের চেয়েও বেশি। এটি বিশে^ সংরক্ষিত মোট তেলের ৫ ভাগের ১ ভাগ। ভেনেজুয়েলা থেকে চীন বড় পরিমাণে অপরিশোধিত তেল কিনে থাকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, ভেনেজুয়েলা ভারী ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি তেলের কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই। তবে বাংলাদেশ যাদের কাছ থেকে তেল আমদানি করে, সেই সব দেশ যদি ভেনেজুয়েলা থেকে জ¦ালানি তেল সোর্সিং করে বা তাদের যদি জ¦ালানি তেলের সোর্স ভেনেজুয়েলা হয়, তা হলে অবশ্যই বাজারে প্রভাব পড়বে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা করেছে এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে।
বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায়, ভেনেজুয়েলা তেল উত্তোলন করে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল। এটি বিশ্বের মোট উত্তোলনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। তেল উত্তোলনের এই পরিমাণ ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতা নেওয়ার আগের সময়ের অর্ধেক। আর ১৯৯৯ সালে সমাজতন্ত্রীরা ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় বসার আগের সময়ের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশের কম।
জ¦ালানি তেল কম উত্তোলনের কারণ হলো ভেনেজুয়েলা সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। ফলে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর অবস্থা খারাপ হচ্ছে এবং উত্তোলনের সক্ষমতা কমছে।
২০০৫ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেত্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম কমাতে ২০২২ সালে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি শেভরনকে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গত মার্চে ট্রাম্প ওই লাইসেন্স বাতিল করেন। তবে মাদুরো সরকার এ থেকে কোনো আয় করতে পারবে না এমন শর্তে আবার অনুমতি দেন তিনি।
ইআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ভেনেজুয়েলা থেকে এক লাখ দুই হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা মোট তেলের দশম উৎস ছিল ভেনেজুয়েলা। একই সময় পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে প্রতিদিন ২ লাখ ৫৪ হাজার ব্যারেল এবং কানাডা থেকে ৪১ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে ওয়াশিংটন।
ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বড় কারণ হলো এই তেল তাদের কাছাকাছি রয়েছে, দামও কম। আঠালো ও বেশি ঘনত্বের কারণে এই তেল বেশি পরিশোধনের দরকার পড়ে। এ জন্যই এটি কম দামে পাওয়া যায়।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর যদি পতন হয় আর বিশাল এই তেলের ভাণ্ডারের ওপর থেকে যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তা হলে সুবিধা পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।


















