ঝিরি, পাহাড় আর প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে অপার সৌন্দর্য, নিস্তব্ধতা আর মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য জগৎ। ভ্রমণপিপাসু ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে পাহাড় সবসময়ই বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ঋতুভেদে পাহাড়ের রূপ বদলায় শীতে কুয়াশার চাদরে মোড়া রহস্যময়তা, আর বর্ষায় সবুজে ঢাকা জীবন্ত প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় পাহাড়ের চিরচেনা যৌবন।
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সুউচ্চ পাহাড়, ঘন বনভূমি, ঝরনা ও আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ মিলিয়ে এ অঞ্চল পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়। তাই সুযোগ পেলেই পর্যটকরা ছুটে যান এই পাহাড়ি জনপদে।
তবে পাহাড়ের এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু বাস্তবতা ও ঝুঁকি, যা অনেক সময় পর্যটকদের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা, অপহরণ, সড়ক অবরোধ কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকির খবর পাওয়া যায়। ফলে পাহাড়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ে ভ্রমণ কতটা নিরাপদ?
পাহাড়ে ভ্রমণ পুরোপুরি অনিরাপদ এমন বলা যাবে না। তবে এটি “শর্তসাপেক্ষ নিরাপদ”। অর্থাৎ সঠিক সময়, পরিকল্পনা, তথ্য ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চললে পাহাড় ভ্রমণ অনেকাংশে নিরাপদ করা সম্ভব। পার্বত্য অঞ্চলের অনেক এলাকা দুর্গম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত। আবার কিছু এলাকায় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা হঠাৎ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব বিষয় সম্পর্কে আগাম ধারণা না থাকলে ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে পাহাড়ে।
অনেক পর্যটক শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা ভেবে হুট করে ভ্রমণে বের হয়ে পড়েন, কিন্তু স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে সমস্যায় পড়েন। তাই পাহাড়ে ভ্রমণের আগে শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া জরুরি।
পাহাড়ের বাস্তব উদাহরণ: সাজেকের অবরোধ ও পর্যটক উদ্ধার!
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটে, যা পাহাড়ি ভ্রমণের ঝুঁকির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

সশস্ত্র সংগঠনের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে অন্তত এক হাজারের বেশি পর্যটক সেখানে আটকা পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে যে, খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের প্রায় ৬০-৬২ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্যোগ নেয় সেদিন পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো খাগড়াছড়ি রিজিয়নের বাঘাইহাট সেনা জোনের কর্মরত আর্মি অফিসার না। অসুস্থতা আর জরুরি প্রয়োজন রয়েছে এমন ৩৫ জন পর্যটককে অগ্রাধিকার দিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। মোট সাতটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ধাপে ধাপে এই উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে সেনাবাহিনী।
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়, সংকট মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যকর পদক্ষেপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উদ্ধার নয়, পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ধাপে ধাপে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ছিলো।
পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা:

পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণ নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করে থাকে। তাদের ভূমিকা বহুমাত্রিক কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো।
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:
পাহাড়ি সড়ক, পর্যটন কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল দিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে নিরাপত্তা বাহিনী। পাহাড়ের সংকট মোকাবিলা ও উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রেখেছে বিশেষ করে অবরোধ, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আটকা পড়া পর্যটকদের উদ্ধার ও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
ভ্রমণের আগে পর্যটকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। যেকোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সড়ক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ ও পুনরুদ্ধারে কাজ করে নিরাপত্তা বাহিনী। উপজেলা প্রশাসন ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
পাহাড় ভ্রমণে করণীয়:
পাহাড়ে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলা উচিত তার মধ্যে ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি জেনে নিন স্থানীয় প্রশাসন বা নিরাপত্তা বাহিনীর পরামর্শ নিন। নির্ভরযোগ্য গাইড ছাড়া দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করবেন না। দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করুন, একা না যাওয়াই ভালো ভ্রমণ পরিকল্পনা (কতদিন, কোথায়, কারা) আগেই নির্ধারণ করুন জরুরি যোগাযোগ নম্বর সঙ্গে রাখুন। অবরোধ, ধর্মঘট বা রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন। পাহাড়র ভ্রমণে সবসময় সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রাখুন।
পরিশেষে বলা যায়, পাহাড় মানেই শুধু সৌন্দর্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাস্তবতা, ঝুঁকি ও দায়িত্বশীলতা। সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিরাপত্তা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণকে অনেকাংশে নিরাপদ করে তুলেছে। তবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও পর্যটকের ওপর বর্তায়। পরিকল্পিত ভ্রমণ, সঠিক তথ্য ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চললেই পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে নিশ্চিন্তে। ভয় নয়, বরং উপভোগই হবে পাহাড় ভ্রমণের মূল অনুভূতি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার যে সহযোগিতা তা দেশের মানুষ যুগের পর যুগ মনে রাখবে এমন প্রত্যশা মানুষের।


















