পার্বত্য চট্টগ্রাম রাষ্ট্রের মানচিত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও জটিল ভূখণ্ড। তিন জেলার রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিন জেলা জুড়ে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে যার প্রাণ কেন্দ্রবিন্দু একটাই “চাঁদাবাজির অর্থনীতি” সশস্ত্র সংগঠন গুলোর আধিপত্য বিস্তার এবং একক নিযন্ত্রণে অতিষ্ঠ পাহাড়ের জনপদ।
তথ্য রয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ঠিকাদার, পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, সড়ক পথে, উন্নয়ন কর্মকান্ডে এবং সাধারণ নাগরিকদের চাপ প্রয়োগ করে পাহাড়ে একাধিক কাঠামোবদ্ধ প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করছে। তাদের চাঁদা কালেকশন করার কিছু ধরন রয়েছে যেগুলো দৈনিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক এবং বার্ষিক এই চার স্তরের চাঁদার গ্রহণ করা হয়। এই “পেমেন্ট সিস্টেম” এক অলিখিত বাস্তবতা তা রাষ্ট্রের সব মহল অবগত তবে নেই কোন প্রতিকার।
“চাঁদার মেশিনারি” অভিযোগে বহুমুখী কাঠামোঃ
অনুসন্ধানে পাওয়া যায় পার্বত্য অঞ্চলে একাধিক প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাদের নেটওয়ার্ক বিভিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদা প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে পরিবহন খাত পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে তা দিতে হয় বিভিন্ন ক্যাটাগড়িতে। ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে “অগ্রিম সমঝোতা” ছাড়া কাজ শুরু করা কঠিন। কৃষিপণ্য পরিবহনেও নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত চাঁদা দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে টোকেন বা রসিদ-সদৃশ সিস্টেম ব্যবহৃত হয় এখন। “এটা এখন আর এককালীন ঘটনা না। মাসে মাসে নির্দিষ্ট হিসাব থাকে। না দিলে ব্যবসা চালানো বন্ধ, অপহরণ হয় শ্রমিক’রা।”
ভয়ের অর্থনীতি: নীরবতার সংস্কৃতি কেন?
পার্বত্য চট্টগ্রামে এ-সব অভিযোগগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কোন নাগরিক খোলাখুলি কথা বলার সাহস দেখান না বরং অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ অভিযোগ করেন, তারা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় মুখ খুলতে পারছেন না, কারন তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না রাষ্ট্রের ভূখন্ড। ফলে তৈরি হয়েছে এক ধরনের “নীরব অর্থনীতি”, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত’রা জানলেও প্রকাশ করতে পারেন না। “রাস্তায় নামলে কোথায় কত দিতে হবে। না দিলে গাড়ি আটকে দেওয়া বা অন্য ঝামেলা হয়। তাই কেউ ঝুঁকি নেয় না।” সবাই নিরবতা পালন করে জীবন পার করছে।
পরিবহন খাত: সবচেয়ে বেশি চাপের অভিযোগঃ
এ অঞ্চলের ভৌগোলিক জটিলতার কারণে পরিবহন খাত এমনিতেই অনেক ব্যয়বহুল। সশস্ত্র সংগঠন গুলোর অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে দিন দিন। পাহাড় থেকে রাজধানীর ঢাকাতে যদি বনের কাঠ পাঠাতে হয়। তাহলে পরিবহনে খরচ একরকম থাকে না প্রতিটি মোড়ে চলে চাঁদার স্বর্গ-বানিজ্য কিন্তু পথে পথে বিভিন্ন জায়গায় আলাদা খরচ দিতে গিয়ে মোট ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা কমছে, ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, কিছু এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সড়ক নির্মাণ, সেতু প্রকল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ বন্ধ বা ধীরগতির হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। একাধিক প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী,“কাজের এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে ঠিকাদাররা স্বাভাবিকভাবেই কাজ এগিয়ে নিতে পারে না।”
প্রশাসনের অবস্থান: নিয়ন্ত্রণ বনাম সীমাবদ্ধতাঃ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, পার্বত্য অঞ্চলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। “যতগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত তাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” তবে একই সঙ্গে তারাও স্বীকার করেন যে দুর্গম ভূখণ্ড সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ছড়িয়ে থাকা জনবসতি এসব কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন। ফলে চাঁদা ও অতিরিক্ত খরচের কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে বছরে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি খাত, পরিবহন খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা, উন্নয়ন প্রকল্প, সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষণ: পাহাড়ে ক্ষমতা, অর্থনীতি ও ভয় তিন স্তরের বাস্তবতাঃ
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, আঞ্চলিক বিভাজন, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, এই সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল কাঠামো, যেখানে অভিযোগ, অস্বীকার এবং বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।

















