অনতিবিলম্বে দাবি মানা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এর দায় সরকারকে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পার্বত্য চুক্তির আগে যেভাবে জমি বেদখল করা হয়েছে, পরবর্তীতে আরও অধিকতর জমি নানাভাবে বেদখল করা হচ্ছে। এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ সরকার আমাদের দাবিগুলো অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন না করলে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শ কমিটিগুলো বাতিল না করলে পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এর জন্য সরকার দায়ী থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘুতে পরিনত করার জন্য বিএনপি দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ।
আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাঙ্গামাটি শহরের রাজবাড়ী সড়কের সাবারাং রেস্টুরেন্টে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম সরণার্থী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোসিত চাকমা এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, বিদ্যমান আইন ও বিশেষ শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে। সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার ও পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে অন্যত্র পদায়ন এবং চুক্তি লঙ্ঘন না করে ওই মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো পুনর্গঠন ও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সন্মেলনে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির আশায় বিগত ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনসাধারন বিএনপিকে ভোট দিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে দেশের মধ্যে সর্ব্বোচ্য ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। সংসদে পাঠানোর পর বিএনপি সরকার রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীও করেছে। কিন্ত ১০২ দিনের মাথায় মন্ত্রনালয় থেকে সরিয়ে দিয়ে পার্বত্য বাসীর আশা আকাঙ্খাকে পদধলিত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধান করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদন করা হয়। আমরা মনে করি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত। তাই সরকারের উপরোল্লিখিত সকল জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রত্যাহার ও পুনর্মূল্যায়ন করা প্রযোজন। তাই আমাদের দাবী হলো-
১। মীর হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে সরিয়ে অন্যত্র পদায়ন করা এবং চুক্তি লংঘন না করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কোন প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী নিয়োগ না দেওয়া।
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হেলাল উদ্দিনকে তিন পার্বত্য জেলার আইন-শৃংখলা, দুর্নীতি, ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনকল্যানমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারী কার্যাবলী তদারিক ও সমন্বয়ের দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদান করা।
৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের বৈধ ও উপযুক্ত প্রতিনিধির সাথে আলোচনা করে গঠিত তিনটি কমিটি: ১। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, ২। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি ও ৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি সমূহের কার্যক্রম বাতিলকরণসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তিনটি কমিটি: ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি ২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি; ও ৩. ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা।
৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার রোডম্যাপ ঘোষনা করে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এর আগে একই অভিযোগ করে গত রোববার(২৭ সেপ্টেম্বর) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা প্রশাসক কার্য্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্বারকলিপি দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ।
সংবাদ সন্মেলনে লিখিত বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা। এতে অন্যান্যর মধ্যে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চটগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কে সহ সভাপতি এ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, আদিবাসী ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি নব কুমার চাকমা, অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোসিত চাকমা বকুল, অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক মধু মঙ্গল চাকমা ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক ইন্টু মনি তালুকদার।


















