পার্বত্য রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার ছাংখ্যংওয়া এলাকায় দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শুরু হয়েছে নতুন মৌসুমের কৃষিকাজ। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে প্রকৃতির রূপ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মাঠে ফিরেছে কৃষকের চিরচেনা ব্যস্ততা।
সবুজ পাহাড়, বন ও আঁকাবাঁকা খালের মাঝখানে অবস্থিত বিস্তৃত কৃষিজমিগুলো এখন মানুষের পরিশ্রমে মুখর। ভোরের নরম রোদে কাদামাখা জমিতে সারিবদ্ধভাবে ধান রোপণে ব্যস্ত কৃষকেরা যেন গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছেন।
মাঠে দেখা যায়, কেউ কোমর ঝুঁকিয়ে হাতে হাতে ধানের চারা রোপণ করছেন, আবার কেউ গবাদিপশুর সাহায্যে জমি চাষে মগ্ন। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখানে এখনো সীমিত হলেও কৃষকেরা পূর্বপুরুষদের অনুসৃত ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেই আস্থাশীল। একাংশ জমিতে দেখা যায়, একটি জোড়া বলদের সাহায্যে লাঙল দিয়ে জমি চাষ করছেন এক কৃষক। কাদা-পানিতে বলদের ধীর অথচ শক্তিশালী পদচারণায় জমি তৈরি হচ্ছে ধান রোপণের উপযোগী করে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এই পদ্ধতিতে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা বজায় থাকে এবং পরিবেশের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না।
স্থানীয় কৃষক মংচিং মারমা বলেন, আমরা এখনও প্রাচীন পদ্ধতিতেই চাষাবাদ করি। ট্রাক্টর বা আধুনিক যন্ত্রপাতি সবার পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। বলদ আর মানুষের পরিশ্রমেই আমাদের জমি প্রস্তুত হয়। এতে খরচ কম লাগে, আবার জমিও ভালো থাকে। এই কৃষিকাজে নারী কৃষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছবিতে দেখা যায়, দলবদ্ধভাবে নারী কৃষকেরা ধানের চারা রোপণ করছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষি সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মিলেই মাঠের কাজ করেন। এই সম্মিলিত অংশগ্রহণ শুধু কাজের গতি বাড়ায় না, বরং গ্রামীণ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
নারী কৃষক থুইমা মারমা বলেন, ধান রোপণের সময় আমরা সবাই একসঙ্গে মাঠে নামি। দলবদ্ধভাবে কাজ করলে কষ্ট কম হয়, সময়ও বাঁচে। এটা আমাদের পাহাড়ি সমাজের পুরোনো রীতি।
কৃষকেরা জানান, চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ভালো ফলনের আশা করছেন তারা। তবে পাহাড়ি জনপদের কৃষিতে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সেচব্যবস্থার অভাব, উন্নত বীজ ও আধুনিক কৃষি সহায়তার সংকট এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া—এসব সমস্যা কৃষকদের প্রতিনিয়ত ভোগাচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় এক প্রবীণ কৃষক বলেন, আমাদের পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কম। যদি সরকারিভাবে সেচ, প্রশিক্ষণ আর ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পাহাড়ি কৃষকের জীবনমান অনেক উন্নত হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। যথাযথ পরিকল্পনা ও আধুনিক সহায়তার সমন্বয় ঘটানো গেলে এসব পদ্ধতি আরও কার্যকর হতে পারে। এতে একদিকে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে পাহাড়ি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকবে।
সব মিলিয়ে, রাজস্থলী উপজেলার পাহাড়ি জনপদের এই কৃষিচিত্র শুধু ধান চাষের একটি সাধারণ দৃশ্য নয়—এটি মানুষের কঠোর পরিশ্রম, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্য, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং টিকে থাকার সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা এই কৃষিজীবন আজও জানান দিচ্ছে—পরিশ্রম আর ঐক্যই গ্রামীণ সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি।


















