পাহাড়ে প্রকৃতি, সম্পদ ও সম্ভাবনার এক অপার ভান্ডার। কৃষি, পয, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র শিল্প, বনজ সম্পদ ও সীমান্ত বাণিজ্যে এ অঞ্চলের উন্নয়নের সম্ভাবনা বিশাল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন গুলোর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অপহরণ এবং ভয়ভীতির কারণে এই সম্ভাবনা নানা প্রতিবন্ধকতায় আটকে আছে।
বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি কাজ এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও চাঁদাবাজির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পাহাড়ে উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়গুলোর একটি হিসেবে বারবার উঠে এসেছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি।
বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কখনো “বিপ্লবী ট্যাক্স”, কখনো “সংগঠন পরিচালনা ব্যয়”, আবার কখনো নিরাপত্তার নামে আদায় করা হচ্ছে অর্থ। এতে একদিকে যেমন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমও বারবার বাধার মুখে পড়ছে।
পার্বত্য অঞ্চলে সরকারের নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, সড়ক নির্মাণ, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, কৃষি উন্নয়ন, পর্যটন অবকাঠামোসহ বহু প্রকল্প। কিন্তু এসব প্রকল্পের বড় অংশই চাঁদাবাজির কারণে ব্যাহত হচ্ছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, কাজ শুরুর আগে, কাজ চলাকালে এমনকি বিল উত্তোলনের সময়ও চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ, যন্ত্রপাতি পুড়িয়ে দেওয়া, শ্রমিক অপহরণ কিংবা প্রাণনাশের হুমকির মতো ঘটনাও ঘটে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, কাজের গতি কমে যায় এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদার অতিরিক্ত ব্যয় পুষিয়ে নিতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেন ফলে উন্নয়নের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এতে রাষ্ট্র যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি সাধারণ মানুষও কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক মানেই বাজার, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি। কিন্তু সড়ক নির্মাণ প্রকল্পেও চাঁদাবাজির কারণে কাজ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
পাহাড়ের বহু প্রত্যন্ত এলাকায় রাস্তা নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও প্রকৌশলী’রা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে কাজ করেন। সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি, চাঁদার চাপ কিংবা অপহরণের আশঙ্কায় অনেক সময় কাজ বন্ধ থাকে। এতে যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন ধীরগতির হয়, আর জনগণও বঞ্চিত হয় উন্নয়নের সুফল থেকে।
যে কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা ও চাঁদাবাজি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। পাহাড়ে ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, দোকানদার, কাঠ ব্যবসায়ী, ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন।
পরিবহন থেকে শুরু করে বাজারে পণ্য আনা-নেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদা দিতে হলে ব্যবসার খরচ বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়ে, বাজার অস্থির হয়। অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প বা পর্যটন বিনিয়োগ শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি ও চাঁদাবাজির কারণে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম পর্যটন সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সাজেক, নীলগিরি, বগালেক, কেওক্রাডং, আলীকদমসহ নানা স্থানে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা শঙ্কা পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখনই কোথাও অপহরণ, চাঁদাবাজি বা সশস্ত্র তৎপরতার খবর আসে, পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পর্যটক কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন হোটেল ব্যবসায়ী, গাইড, যানবাহন চালক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী।
একটি নিরাপদ পরিবেশ থাকলে পাহাড় পর্যটন দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারতো। কিন্তু চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস সেই সম্ভাবনাকে অনেকাংশে ব্যাহত করছে।পাহাড়ে কৃষি, ফল উৎপাদন, জুম চাষ এবং বনজ সম্পদনির্ভর অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারজাতকরণ কিংবা স্থানীয় ব্যবসায় চাঁদাবাজি কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কৃষক অভিযোগ করেন, পণ্য পরিবহন কিংবা হাট-বাজারকেন্দ্রিক লেনদেনেও নানা অনানুষ্ঠানিক চাপ থাকে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, কৃষকের লাভ কমে যায়। যেখানে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে পারে, সেখানে চাঁদাবাজি সেই উন্নয়নকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
চাঁদাবাজি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, সামাজিক উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। পাহাড়ের বহু দুর্গম এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এখনো চ্যালেঞ্জ। সেখানে নিরাপত্তাহীনতা থাকলে শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা উন্নয়নকর্মীদের কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় স্কুল নির্মাণ, শিক্ষাপ্রকল্প, এনজিও কার্যক্রমও নানা বাধার মুখে পড়ে। ফলে পিছিয়ে পড়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন।
চাঁদাবাজির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়। নিরাপত্তা খরচ বাড়ে, কাজ বিলম্বিত হয়, পুনরায় কাজ করতে হয়, সরঞ্জাম নষ্ট হয়। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি পায়। যে অর্থ নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হওয়ার কথা, তা অনেক সময় ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই ব্যয় হয়ে যায়। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর।
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহন শ্রমিক, দোকানদার, চাকরিজীবী অনেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর প্রভাব বহন করেন। উন্নয়ন থেমে গেলে ভোগান্তি বাড়ে জনগণেরই। সড়ক না হলে যাতায়াত কষ্টকর, হাসপাতাল না হলে চিকিৎসা সংকট, বাজার না গড়ে উঠলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা সবই সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে।
সরকার পাহাড়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও যোগাযোগে বহু উদ্যোগ নিয়েছে। সেনাবাহিনী, প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা উন্নয়ন কাজে যুক্ত রয়েছে। তবু চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কারণে অনেক উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতি পায় না। উন্নয়নের জন্য শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
অনেক ঠিকাদার পাহাড়ি প্রকল্প নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। কারণ কাজ করতে গেলে অতিরিক্ত ঝুঁকি, নিরাপত্তা ব্যয় এবং চাঁদার চাপ মোকাবিলা করতে হয়। এতে প্রতিযোগিতামূলক মানসম্পন্ন ঠিকাদারও অনেক সময় আগ্রহ হারায়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
পাহাড়ে টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা, আইনের শাসন ও উন্নয়নকে একসাথে এগোতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি পৌঁছাবে না। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা জোরদার, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, উন্নয়ন প্রকল্পে নজরদারি সব মিলিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
উন্নয়ন কখনো ভয়ভীতির মধ্যে টেকসই হয় না। যেখানে চাঁদাবাজি, অপহরণ, সন্ত্রাস থাকবে, সেখানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবেই।
পাহাড়ের জনগণ উন্নয়ন চায়, শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়। এই চাহিদা বাস্তবায়নে চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ অপরিহার্য।
পাহাড়ে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার এ বাস্তবতায় করণীয় হতে পারে চাঁদাবাজি দমনে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা। উন্নয়ন প্রকল্পে নিরাপত্তা জোরদার। ঠিকাদার ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি
স্থানীয় জনগণকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা
সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পর্যটনে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান
পাহাড়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্ভাবনার অঞ্চল। এই অঞ্চল দেশের অর্থনীতি, পর্যটন, কৃষি এবং কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি উন্নয়নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চাঁদাবাজি শুধু অর্থ আদায়ের বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন থামিয়ে দেয়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই পাহাড়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে চাঁদাবাজিমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সম্ভাবনার পাহাড়কে এগিয়ে নিতে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সমন্বিত পথই হতে পারে স্থায়ী সমাধান।


















