পুরোনো বছরের সকল গ্লানি, দুঃখ, কষ্ট আর জরাজীর্ণতাকে ধুয়ে মুছে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে পাহাড় জুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। সেই আনন্দ ধারাকে পূর্ণতা দিতে রাঙামাটিতে জমকালো জলকেলি উদযাপিত হয়েছে। মারমা জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব ‘সাংগ্রাই’।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকালে রাঙামাটি চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়ামে মারমা সংস্কৃতি সংস্থা (মাসস)-এর উদ্যোগে দিনব্যাপী এই বর্ণিল আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় জল উৎসব পানি খেলা।আলোচনা সভা শেষে অতিথিদ্বয়রা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে ‘সাংগ্রাই মৈত্রী জল উৎসব’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
উৎসবস্থলে দেখা যায়, দুই লাইনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদল মারমা তরুণ-তরুণী। সামনে ছিল বড় পাত্র ভর্তি জল। একে অপরের গায়ে অবিরাম পানি বর্ষণ করে তারা ধুয়ে নিচ্ছে ফেলে আসা বছরের সব গ্লানি। মারমা ভাষায় একে বলা হয় ‘সাংগ্রাই রিলং পোয়ে’। যার মূল মন্ত্র হলো শুদ্ধতা আর ভালো বাসায় আগামীকে বরণ করে নেওয়া। মারমা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, এই পবিত্র পানি কেবল দেহ নয়, মনকেও সমানভাবে পরিশুদ্ধ করে।
সাংগ্রাই কেবল নিছক আনন্দ উৎসব নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। পুরোনো বছরের সকল কষ্ট ও বেদনাকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শপথ নেন উৎসবকামী মানুষ। সাংস্কৃতিক পর্বে মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচের ছন্দে পুরো স্টেডিয়াম এলাকা রূপ নেয় এক খণ্ড পাহাড়ি সংস্কৃতিতে। তরুণ-তরুণীদের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাঙামাটি শহরে।
উৎসবে অংশ নেওয়া মারমা তরুণী নবনীতা মারমা জানান, “সারা বছর আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। মৈত্রী পানি ছিটিয়ে আমরা একে অপরের মঙ্গল কামনা করি।” পাহাড়ের এই নান্দনিক রূপ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাঙামাটিতে ভিড় জমিয়েছেন অসংখ্য পর্যটক। অনেকেই স্থানীয়দের সঙ্গে জলকেলিতে অংশ নিয়ে এই উৎসবকে উপভোগ করেন এবং ক্যামেরাবন্দি করেন স্মরণীয় মুহূর্ত।
পর্যটক সুভাষ বাসনা দম্পতি বলেন, “পাহাড়ের মানুষ এত চমৎকারভাবে উৎসব পালন করে তা সরাসরি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এই জল উৎসব আমাদের মুগ্ধ করেছে।”
আয়োজক সংগঠন মারমা সংস্কৃতি সংস্থা (মাসস)-এর উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি পাইচিমং মারমা বলেন, “সাংগ্রাই কেবল একটি উৎসব নয়, এটি পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের কৃষ্টি তুলে ধরাই এই আয়োজনের লক্ষ্য।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক, রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মোহাম্মদ একরামুল রাহাত, পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ রকিব উদ্দিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
প্রধান অতিথির বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি বলেছেন, পার্বত্যাঞ্চলের সুষম উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। পার্বত্যাঞ্চলের অঞ্চলের উন্নয়নে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান ও উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান পাহাড়ের মানুষের সংকট নিরসনে কাজ শুরু করেছেন। তিনি বলেছেন, তিন পার্বত্য জেলার জনসাধারণ বিএনপির প্রতি আস্থা এবং জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস আছে বিধায় পাহাড়ের তিনটি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল স্তম্ভ হচ্ছে এখানকার ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সবকিছু মিলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে যে কৃষ্টি-কালচার ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে তা রক্ষা করতে হবে। এখানে বসবাসকারী কিছু কিছু জনগোষ্ঠী অস্তিত্বের সম্মুখীন। তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে যা কিছু করার আছে তা করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি ধারণ করে দেশ উন্নতি ও সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যাবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি বলেছেন, বাংলাদেশের জীবন বৈচিত্র যেমন বৈশিষ্ট্য—ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আমরা সকলেই বাংলাদেশী হিসেবে যে কোনো সংস্কৃতিকে ধারণ করতে পারি এবং সম্মান করতে পারি। এই প্রত্যয় নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সকল ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সেই আদর্শকে ধারণ করে বাংলাদেশে ‘রংধনু সংস্কৃতি’ ও সম্প্রীতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের হলেও এখানে সকল সম্প্রদায়ের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এসবের বর্ণিল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই হলো প্রকৃত বাংলাদেশ। তিনি এই সম্প্রীতির বন্ধনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, দিনভর জলকেলি, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও মিলনমেলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের বর্ষবরণ উৎসব।
সাংগ্রাইয়ের পবিত্র পানি যেমন ধুলোবালি ধুয়ে দেয়, তেমনি মানুষের হৃদয়ের সব দ্বেষ-বিদ্বেষ মুছে দিয়ে একটি সুন্দর, সম্প্রীতিময় ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে—এই প্রত্যাশা নিয়েই ঘরে ফেরেন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষ।


















