পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়, বিচ্ছিন্ন জনপদ, যোগাযোগস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতায় দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের ধারা জোরদার করতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, মানবিক সহায়তা, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পাহাড়ের উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অবদান দৃশ্যমান।
পাহাড়ে টেকসই উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়! বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও মানবিক উন্নয়নের সমন্বিত অগ্রযাত্রা উন্নতি হয়েছে।
পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলের বহু মানুষ এখনও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। অনেক এলাকায় হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ কিংবা জরুরি চিকিৎসা সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। সেনাবাহিনী নিয়মিত বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজন, ওষুধ বিতরণ এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে পাহাড়ের চিকিৎসা সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম পৌঁছে সাধারণ মানুষ’কে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য, টিকাদান, চক্ষু চিকিৎসা, সাধারণ রোগের চিকিৎসা ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা স্থানীয় জনগণের জন্য আশীর্বাদ হিসাবে ধরা দিচ্ছে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা থেকে জটিল রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সহায়তায় রোগী পরিবহন, জরুরি উদ্ধার এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার নজিরও রয়েছে।
পাহাড়ের সাধারণ মানুষের পাশে মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। শীতবস্ত্র বিতরণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা উপকরণ প্রদান, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, এতিম ও অসহায়দের সহায়তা। এসব কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেনাবাহিনী বিনামূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আত্মকর্মসংস্থানমূলক সহায়তা দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন পাহাড় ধস, বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমেও সেনাবাহিনী প্রথম সারিতে থাকে। দুর্যোগ ও পরবর্তী খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে তাদের সক্রিয়তা পাহাড়বাসীর জন্য বড় ভরসা।
টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে অবকাঠামো। পার্বত্য অঞ্চলে দূর্গমতা কাটিয়ে উন্নয়নের দুয়ার খুলতে সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন অনেক পাহাড়ি এলাকা বর্ষায় বিচ্ছিন্ন থাকত। কোথাও নদী পারাপারে ঝুঁকি, কোথাও পাহাড়ি পথের কারণে যাতায়াত ছিল দুরূহ। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণ, মেরামত ও যোগাযোগ উন্নয়ন হওয়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি এসেছে।
দুর্গম পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ শুধু যাতায়াত সহজ করেনি; বরং বাজার ব্যবস্থা, কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন বিকাশ এবং সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক অঞ্চলে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ বর্ষাকালের বিচ্ছিন্নতা কমিয়েছে। আগে যেখানে রোগী হাসপাতালে নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, এখন যোগাযোগ সহজ হওয়ায় জরুরি সেবা দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
পাহাড়ে উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সড়ক যোগাযোগ। এই খাতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বহু সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে সেনাবাহিনী অংশ নিয়েছে। সড়ক মানেই শুধু যোগাযোগ নয়। এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও দুয়ার। নতুন সড়ক হওয়ার ফলে কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে পারছে, শিক্ষার্থী’রা স্কুলে যেতে পারছে, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছে, পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে। সড়ক উন্নয়ন স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। আগে যেসব অঞ্চলে পণ্য পরিবহন ব্যয়বহুল ছিল, এখন যোগাযোগ উন্নয়নের কারণে উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণ সহজ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম পাহাড়ি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণেও সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাহাড় ধস বা বৃষ্টিতে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত সংস্কার করে যোগাযোগ সচল রাখার কাজও তারা করে থাকে।
টেকসই উন্নয়ন কেবল রাস্তা বা ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা সহায়তা, স্কুলে উপকরণ বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অনেক দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে সেনা পরিচালিত সহায়তামূলক উদ্যোগ স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে। যুব সমাজকে দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখছে। কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ দারিদ্র্য হ্রাসেও সহায়ক।
পাহাড়ের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। জুম চাষ, ফল চাষ, সবজি উৎপাদন ও বনজ সম্পদের ওপর বহু মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। সেনাবাহিনীর সহায়তায় অনেক এলাকায় উন্নত কৃষি পদ্ধতি, চারা বিতরণ, কৃষি সচেতনতা এবং উৎপাদন বৃদ্ধিমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের বাজার সংযোগ, উৎপাদন পরিবহন এবং নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হওয়ায় টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অপরিহার্য। পাহাড়ে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি উন্নয়ন সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সেনাবাহিনী ভূমিকা রাখছে। দুর্গম অঞ্চলে সরকারি সেবা পৌঁছানো, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের চলাচল নিরাপদ করতে স্থিতিশীল পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হলে বিনিয়োগ বাড়ে, পর্যটন প্রসারিত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ে যা সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক হিসাবে অবধান রাখে।
পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় ধস, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায়শই জনজীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। দুর্যোগ মোকাবিলা ও উদ্ধার কার্যক্রমে সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্গতদের উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনরুদ্ধার, আশ্রয় সহায়তা এবং পুনর্বাসনে সেনাবাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়ক হয়। বিশেষ করে পাহাড় ধসের সময় উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর দক্ষতা বহু প্রাণ বাঁচিয়েছে।
পাহাড়ে পর্যটনের সম্ভাবনা বিশাল। সুন্দর সড়ক, নিরাপদ পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে পর্যটন খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে। পর্যটন কেন্দ্রের যোগাযোগ উন্নয়ন, নিরাপত্তা সহায়তা এবং অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ার ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বেড়েছে। পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে, যা টেকসই উন্নয়নে সহায়ক।
পাহাড়ের বহু প্রত্যন্ত এলাকায় আগে রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছানো ছিল সীমিত। সেনাবাহিনীর সহায়তায় অনেক দূরবর্তী অঞ্চলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশাসনিক সহায়তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পৌঁছেছে। এটি শুধু উন্নয়ন নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের উদাহরণ। দুর্গম এলাকার মানুষ যখন সেবা পায়, তখন উন্নয়ন বাস্তব অর্থে টেকসই হয়।


















