শনিবার , ৩০ মে ২০২৬ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

পাহাড়ের পর্যটন ব্যবসা: স্থানীয়রা কতটা লাভবান

প্রতিবেদক
বিশেষ প্রতিবেদক
মে ৩০, ২০২৬ ৭:৩৪ অপরাহ্ণ

পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান, দীর্ঘদিন ধরেই অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সবুজ পাহাড়, মেঘের রাজ্য সাজেক, ঝরনা, নদী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে পার্বত্য অঞ্চলকে একটি অনন্য গন্তব্যে পরিণত করেছে। তবে পর্যটন শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদনের বিষয় নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রশ্ন হচ্ছে, পাহাড়ের পর্যটন ব্যবসা থেকে স্থানীয় জনগণ কতটা লাভবান হচ্ছে?

আমরা যদি লক্ষ করি পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটনের বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগণের জন্য নতুন নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একসময় যেখানে অধিকাংশ মানুষ শুধুমাত্র কৃষি ও জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে বর্তমানে পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ এখন পর্যটকদের কাছে নিজেদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারছেন। জুমে উৎপাদিত আদা, হলুদ, মরিচ, তিল, ভুট্টা, বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ও ফলমূল পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পর্যটকরা স্থানীয় ও প্রাকৃতিক পণ্য কিনতে আগ্রহী হওয়ায় কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। এছাড়া পাহাড়ের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা খামার থেকে উৎপাদিত হাঁস, মুরগি, কবুতর এবং অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে কৃষি ও খামারভিত্তিক অর্থনীতি পর্যটনের কারণে নতুন বাজার পেয়েছে।

পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বর্তমানে পাহাড়ের অসংখ্য তরুণ-তরুণী বিভিন্ন হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কেউ রিসোর্টে চাকরি করছেন, কেউ পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত, কেউ গাইড হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ স্থানীয় হস্তশিল্প বিক্রির মাধ্যমে আয় করছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী পর্যটকদের জন্য গাইডিং সেবা দিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন।

বিশেষ করে সাজেক, আলুটিলা, রিছাং ঝরনা, দেবতাখুম কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে স্থানীয়দের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার এখন পর্যটননির্ভর আয় থেকে তাদের জীবনমান উন্নত করতে সক্ষম হচ্ছে।

পর্যটন শিল্প পাহাড়ি নারীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। অনেক নারী নিজ হাতে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী, অলংকার এবং স্থানীয় খাদ্যপণ্য বিক্রি করছেন। পর্যটকদের কাছে এসব পণ্যের চাহিদা থাকায় নারীরা পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখতে পারছেন। এর ফলে নারীর ক্ষমতায়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধিতেও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পর্যটকদের আগমনের ফলে শুধু বড় ব্যবসা নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসাও লাভবান হচ্ছে। চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ফলের দোকান, পরিবহন ব্যবসা, স্থানীয় খাবারের হোটেলসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোগ পর্যটন মৌসুমে ভালো আয় করে থাকে। একজন পর্যটক যখন পাহাড়ে ভ্রমণে আসেন, তখন তিনি শুধু রিসোর্টে অবস্থান করেন না; যাতায়াত, খাবার, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবা গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করেন। এই অর্থ স্থানীয় মানুষের হাতেই পৌঁছে যায় এবং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গতিশীল করে।

পর্যটনের প্রসারের ফলে পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নও ত্বরান্বিত হয়েছে। অনেক দুর্গম এলাকায় পর্যটনের প্রয়োজনেই সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এর সুফল শুধু পর্যটকরা নয়, স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগ করছেন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফলে পর্যটন উন্নয়ন এবং জনকল্যাণ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।

পাহাড়ি পর্যটনের বিকাশে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও সড়কে সেনাবাহিনীর টহল, নিরাপত্তা তৎপরতা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পর্যটকদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করেছে। দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করছে।

বিশেষ করে সাজেকসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পর্যটকরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভ্রমণ করতে পারছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় পর্যটনের প্রসারও সহজ হয়েছে।

যদিও পর্যটন পাহাড়ের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ এই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সশস্ত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতা। বিগত কয়েক বছরে পার্বত্য অঞ্চলে অপহরণ, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ এবং নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন ঘটনার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনা শুধু স্থানীয় মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না, বরং পর্যটন শিল্পের জন্যও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। যখন কোনো এলাকায় অপহরণ বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তখন পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেন বা অন্য গন্তব্য বেছে নেন। ফলে স্থানীয় ব্যবসা, রিসোর্ট, পরিবহন খাত এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। পর্যটকদের সংখ্যা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা। কারণ তাদের আয়ের একটি বড় অংশ পর্যটননির্ভর।

পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন খাতকে আরও বিকশিত করতে হলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকরা এমন জায়গায় ভ্রমণ করতে চান যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করবেন। সুতরাং অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার মতো ঘটনা বন্ধ করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটনের আরও ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এতে স্থানীয় জনগণের আয় বৃদ্ধি পাবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এই সম্ভাবনাময় খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পর্যটনের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা জোরদার করা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাহাড়ে যত বেশি পর্যটক আসবে, তত বেশি লাভবান হবে স্থানীয় জনগণ। আর নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও পর্যটকবান্ধব পার্বত্য অঞ্চলই হতে পারে পাহাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: