পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন পার্বত্য জেলার ত্রাণ কার্য (খাদ্যশস্য ও নগদ) বরাদ্দের এক চাঞ্চল্যকর সরকারি নথি প্রকাশ পেয়েছে। নথিতে দেখা যাচ্ছে, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী পুনর্বাসন, ২৫ হাজার ৬১৮ জন উপজাতীয় পরিবারের গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি এবং জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) তালিকাভুক্ত সদস্যদের খাদ্য পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় হাজার হাজার মেট্রিক টন চাল ও কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই বিপুল বরাদ্দের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো আশানুরূপ ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না। এমন সময় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জাগে, প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রামের নামে যে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, সেই অর্থ দুর্যোগের সময় কোথায় যায়?
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় বিভিন্ন খাতে মোট ৫৬,৬০০ মেট্রিক টন চাল এবং আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় নগদ ৯,০০,০০,০০০/- (নয় কোটি) টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যার মধ্যে ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য ৭৪.৮৮৮ মেট্রিক টন চাল এবং ৬৫,০০,০০০/- (পয়ষাট্টি লক্ষ) টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই ভারতীয় শরণার্থীরা আসলে কারা? এই বরাদ্দের প্রকৃত উপকারভোগী কারা? তারা কি আসলেই এই সহায়তা পাচ্ছে নাকি তা অন্যদের পকেটে যাচ্ছে তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
একইভাবে প্রশ্ন উঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে ঘিরেও। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের জন্য প্রতিবছর যে, ১৩৭৫ মেট্রিক টন চাল এবং ৫০,০০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকা সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়? এই তালিকা কি জনগণের জন্য উন্মুক্ত? নাকি সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব গোপনে বিদেশে সন্তুলারমার নাতি নাতনী কাছে পাঠানো হচ্ছে? আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারে বসে জনগণের ট্যাক্সের এই টাকা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আসা বরাদ্দ ক্ষমতার অপব্যবহার করে লুটপাট ও আত্মসাৎ এর জবাব কি জনসমক্ষে দিতে পারবেন সন্তু লারমা?
এছারাও, প্রকাশিত নথি অনুযায়ী তথাকথিত জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের খাদ্য পুনর্বাসন কর্মসূচির নামে প্রতিবছর যে, ২৩৫৯.৮০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়, সেই অনুদান কাদের দেওয়া হয়? যারা কিনা অস্ত্র জমা দিয়ে সশস্ত্র জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে আসার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে সরকারের সাথে প্রতারণা করেছে তাদের?
সচেতন মহলের মতে, এগুলো কোনো ঢালাও অভিযোগ নয়; বরং জনগণের করের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রশ্ন।
স্থানীয় সচেতন মহলে জোরালো কানাঘুষা চলছে যে, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের শীর্ষ মহলের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে এই বিশাল বরাদ্দ সাধারণ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এমনকি পাহাড়ি অঞ্চলের প্রভাবশালী মহলের শীর্ষনেতারা সরকারের এই কোটি কোটি টাকার তহবিল এবং রেশনের অর্থ তছরুপ করে নিজেদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে ব্যয় করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ কারও বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর সেবার হিসাব চায়। জনগণ জানতে চায়, কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ কোথায় ব্যয় হয়, কারা সেই সুবিধা পায় এবং দুর্যোগের সময় সেই বরাদ্দের বাস্তব প্রভাব কী?
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ চরম মানবিক সংকটে, তখন মাঠে নেমে একমাত্র সেনাবাহিনীকেই ত্রাণ দিতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদ কিংবা অন্য কোন পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ বা সাহায্য সহযোগিতা সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। তাহলে এই বিপুল পরিমাণ সরকারি বরাদ্দ ও অর্থ যাচ্ছে কোথায়? অথচ এই বিশাল সরকারি বরাদ্দ বা কোটি কোটি টাকার বাজেটের সেনাবাহিনী শুধুমাত্র ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং ৮ হাজার মেট্রিক টন পেয়ে থাকে। এর বাইরেও সেনাবাহিনী নিজেদের জন্য ইস্যুকৃত অবশিষ্ট রেশনের চাল অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে দুর্গম পাহাড়ের দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করে আসছে। অল্প পরিমাণ সাহায্য নিয়েও তারা পাহাড়ের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৃত উন্নয়ন সাধন করছে।
এমতাবস্থায় সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে তীব্র প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, যে বরাদ্দ আঞ্চলিক প্রশাসন, টাস্কফোর্স কিংবা জেলা প্রশাসকদের দেওয়া হচ্ছে, তার সুফল যদি প্রান্তিক মানুষ না-ই পায়, তবে এই বিশাল বরাদ্দের ভার কেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি সৎ ও সুশৃঙ্খল বাহিনীর হাতে দেওয়া হচ্ছে না? যদি এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ও ৯ কোটি টাকার ত্রাণ বরাদ্দ সরাসরি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বণ্টন করা হতো, তবে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকতো না এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চেহারা আজ সম্পূর্ণ পালটে যেতো।
পাহাড়ের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের কাছে জনগণের দাবি, এই বরাদ্দের একটি সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক এবং ভবিষ্যৎ ত্রাণ ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরাসরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে দিয়ে সাধারণ পাহাড়িদের সুফল পাওয়ার পথ সুগম করা হোক।


















