রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের বাঘাইহাট এলাকায় বন বিভাগের জায়গায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারি বনভূমির জমিতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে আপত্তি ওঠার পর বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, “বাঘাইহাট এলাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগটির উদ্দেশ্য হিসেবে স্থানীয় শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও, স্কুল ভবন নির্মাণের জন্য যে জমি ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন।
জমির শ্রেণি, মালিকানা, দখল ও ব্যবহারের অনুমোদনসংক্রান্ত নথিও প্রকাশ্যে আসেনি। অভিযোগ রয়েছে, জায়গাটি যদি সত্যিই বন বিভাগের সরকারি জমি হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে স্থায়ী ভবন নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর অনুমোদন, জমি ব্যবহারের বৈধতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয় অনুমতি নিশ্চিত করা জরুরি। অথচ এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নির্মাণকাজ নিয়ে আপত্তি বা বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীকে দায়ী করে বিভিন্ন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন সেনাবাহিনী দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দিতে চায়। বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর সবসময় পাহাড়ে শিক্ষার প্রসার করতে কাজ করে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর অনুমোদন ছাড়া সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে কোনো স্থাপনা নির্মাণে আপত্তি জানানো হলে সেটিকে সরাসরি কোনো বাহিনীর ‘শিক্ষাবিরোধী অবস্থান’ হিসেবে প্রচার করা কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্নও উঠছে।
সাজেক ও বাঘাইহাট পাহাড়ি ও সংবেদনশীল এলাকার অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চলে বনভূমি, সংরক্ষিত এলাকা, সরকারি জমি এবং বসতিপূর্ণ এলাকার জমির শ্রেণি নিয়ে নানা জটিলতা রয়েছে। ফলে কোনো জায়গায় স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের আগে জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও শ্রেণি নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি শিক্ষা-সংক্রান্ত নথিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জমির দলিল ও খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ শুধু স্থানীয়ভাবে স্কুল করার সিদ্ধান্ত নিলেই কোনো জায়গায় ভবন নির্মাণ করে সেটিকে বিদ্যালয় হিসেবে পরিচালনা করার বৈধতা তৈরি হয় না।
বিশেষ করে বন বিভাগের জমি হলে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। বনভূমির ব্যবহার পরিবর্তন, স্থাপনা নির্মাণ কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। তাই বাঘাইহাটের ওই জমিটি বন বিভাগের হলে সেখানে ভবন নির্মাণের আগে বন বিভাগ, ভূমি প্রশাসন এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না এটাই এখন মূল প্রশ্ন।
স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে সেনাবাহিনী’ দাবির ভিত্তি কী?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বক্তব্যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্কুল নির্মাণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে অভিযোগ এবং বাস্তব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়।।সাজেকের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। বাঘাইহাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে পর্যটকদের চলাচল নিয়েও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ আছে।
সম্প্রতি দুর্যোগের সময়ও সাজেক এলাকায় পর্যটক উদ্ধারে সেনাবাহিনীর ভূমিকার খবর প্রকাশিত হয়েছে। জুলাইয়ে ভারী বৃষ্টির কারণে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের সেনাবাহিনী ও পুলিশের এ-স্কর্টে সরিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম।
তাই কোনো নির্দিষ্ট স্থাপনা নির্মাণে আপত্তি থাকলে সেই আপত্তির প্রকৃত কারণ জানতে হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রশাসনের লিখিত বক্তব্য প্রয়োজন। অনুমান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে ‘সেনাবাহিনী স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে’ এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পাহাড়কে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফেলা মোটেও উচিৎ না।
ভবন উঠেছে, কিন্তু অনুমোদন কোথায়?
বাঘাইহাটের কথিত স্কুল ভবন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে।নির্মাণের অনুমতি কোথায়? একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির বৈধতা, মালিকানা, প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন, ভবনের নকশা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করলে পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি, সনদ, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ফলে স্থানীয় জনগণের আবেগ বা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই বিবেচ্য; কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটানোর পথও হতে হবে আইন ও প্রশাসনিক নিয়মের মধ্যে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সাজেকের বিভিন্ন পাড়ায় বসবাসকারী শিশুদের অনেক দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয় এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যালয় থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার নামে যদি সরকারি বনভূমিতে অনুমোদন ছাড়া স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। একটি বৈধ স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে নির্ধারিত জায়গা নির্বাচন করা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়াই টেকসই সমাধান।
স্থানীয়দের দাবি, স্কুল হলে এলাকার শিশুদের উপকার হবে। আবার সরকারি জমির সুরক্ষা ও আইন মেনে স্থাপনা নির্মাণের দাবিও রয়েছে। এই দুই বিষয়কে পরস্পরবিরোধী না করে প্রশাসনিক প


















