বৃহস্পতিবার , ২ মার্চ ২০২৩ | ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

বিএমএসসি’র পিকনিকে একদিন

প্রতিবেদক
ঞ্যোহ্লা মং
মার্চ ২, ২০২৩ ১০:৪৫ অপরাহ্ণ

পিকনিকে কিংবা দলবেঁধে কোথাও যাওয়া, আনন্দ করা আমার জীবনে খুব কম এসেছে। অর্থ কষ্টে পড়ালেখা করেছি বলে, অনেক কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে হয়েছে। আমার মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সায়াহ্নে বন্ধুরা স্মরণিকা বের করেছিল। চাঁদা ধরা হয়েছিল ২০০টাকা। আমি দিতে পারিনি। একইভাবে হলের স্মরণিকা বের করার সময়ও আমার থেকে ২০০টাকা চাওয়া হয়েছিল, দিতে পারিনি। ফলে স্মরণিকাগুলোতে শুধু নামের তালিকায় নাম থাকলেও, ছবিও অন্যান্য তথ্য আসেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন এক নিকট আত্নীয়ের থেকে চলার জন্য কিছু টাকা পেতাম। যিনি ৬-৭ বছরে বাড়তি একটি টাকাও বেশি দেননি, বলে অনেক কিছু করা হয়ে উঠেনি। মাসের টাকা পেতে তার কাছে গিয়ে মাথা নত হয়ে ভিক্ষুকের মতো বসে থাকতাম। আমার প্রতি তার অভিশাপের শেষ ছিল না। উপায় ছিল না বলে, সব ধরনের ধৈর্য-শৌর্য করে লেখাপড়া শেষ করেছি। সে পর থেকে ভুলেও তার বাড়িতে আর পা রাখিনি। আমাকে তাড়িয়ে দিতো, তারপরও বসে থাকতাম। তার বউও ছিল তার চেয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে আরো গরম এবং আরো ‘— ‘ মনের মানুষ। ভাগ্য ভালো আমি তাদের কোনটি ধারণ করিনি। আমার পরবর্তী ভাইবোনকে যাতে তাদের কাছে যেতে না হয়, তার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।


ছাত্রদের নিয়ে লিখতে বসে নিজ ছাত্র জীবনের কিছু সত্য কথা বলে ফেললাম। এর মাধ্যমে ছাত্রদের সাহস যোগানোর চেষ্টা করলাম। বলার চেষ্টা করলাম জীবনে সকল ধরনের অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। না পাওয়াও আমাদের অনেক কিছু শেখায়। ধৈর্য, কম টাকায় কষ্টে চলার উপায়, ক্ষুধা নিয়ে বাঁচার কৌশল, ভালো দিনের জন্য অপেক্ষা করার সাহসসহ আরো কত কি!
সে থেকে ছাত্রদের ব্যাথা-বেদনা, আর্থিক কষ্টগুলো আমি বুঝতে পারি। বড় কিছু করতে না পারি, কোন ছাত্রের দেখা পেলে অন্তত গাড়ি ভাড়া ৫০ টাকা দিতে চেষ্টা করি। ছাত্রজীবনে ১০-২০টাকা কত মূল্যবান হতে পারে, তা আমি হারে হারে ঢের পেয়েছি।
ঢাকা শহরে অনেক বছর। পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীরা নানা আনন্দ অনুষ্ঠান, পিকনিক করে। অনেক সময় নিমন্ত্রণ পেলেও সময় সুযোগ মিলে না বলে যাওয়া হয় না। এবার বিএমএসসি ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এমনভাবে ধরলেন, না গেলে নাকি ———। অনেকটা তাদের ‘ভয়ে’ যেতে রাজি হই।


  1. বলে রাখি, ঢাকা শহরে যত মারমাদের সমাগম হয়েছে সবই আকুগ্রী ইঞ্জিনিয়ার ক্যসাচিং এর সাহসে। তিনি শুরু থেকে এই সাহসী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। এছাড়া আরো একজন অভিভাবক আছেন, যিনি বিএমবিএ সংগঠনের ব্যানারে ঢাকার অদূরে একটি সুন্দর ক্যাম্পাস নিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এটি মারমা জাতিগোষ্ঠীর একটি সম্মিলিত সম্পদ বললে মনে হয় ভুল বলা হবে না। পিকনিকে উপস্থিত অন্যান্য অভিভাবকদের মুখেও এই দুইজন অভিভাবককে নিয়ে একই প্রশংসা শুনেছি। সময়ের সাথে সাথে অন্যান্যদের সে ভূমিকা পালনের দায়িত্ব নেয়ার গুরুত্ব নিয়ে কথা হতে দেখেছি, শুনেছি। তবে খুশির খবর হলো এবারে মেজর ওয়াংটিং আকু, পিকনিকের সমন্বয়ের দায়িত্ব নিয়ে ক্যসাচিং আকু’র অনেকখানি কাজ হালকা করে দিয়েছেন।
    পিকনিক ভেন্যুতে প্রবেশ করতে গিয়েই আমি অবাক। শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বাগতম জানানোর ছবিগুলো আমাকে দারুন খুশি করেছে। ভেন্যুতে যারা একটু দেরিতে এসেছিল তাদেরও নাস্তা পেতে কোন সমস্যা হয়নি।
    ডাবল ডেকার বাস ভাড়া, এত এত খেলার আয়োজন, মঞ্চ সাজানো, অভিভাবকদের প্রতি যত্ন, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, প্রিয় চথুই প্রু আকু আর ডা: উবানু আকুদের দেখে খুশি হয়েছি। ছাত্রাবস্থায় ছেলেমেয়েরা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা আর সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জন করছে যা আগামীতে তাদের কর্মজীবনকে বর্ণময় করে তুলবে বলে আমার ধারনা। যারাই সঞ্চালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, কেউই কোন ধরনের বাংলা-ইংরেজি সংমিশ্রণ ছাড়াই সাবলিক মারমা ভাষায় উপস্থাপন করতে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমার দেখা এই সেরা উপস্থাপকদের একদিন চায়ের আমন্ত্রণ জানানোর ইচ্ছা থাকলো।
    আমাদের তরুণরা সতেজ, প্রাণবন্ত, উজ্জ্বল বলেই প্রায় তিন শতাধিক মারমার মিলন মেলা হয়েছে। ঢাকা শহরে মারমাদের এত বড় মিলন মেলা আগে কখনো হয়নি বলে বক্তাদের মুখে শুনেছি।
    জেনেছি, মারমাদের মধ্যে প্রথম কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হলেন লে. কর্ণেল উ কান থিন (অবঃ)। তারপর এই পর্যন্ত সর্বোচ্চ কর্ণেল হয়ে অবসর নিয়েছেন কর্ণেল হ্লাহেনমং (অবঃ)। প্রশাসনে সর্বোচ্চ যুগ্ম সচিব হয়ে অবসরে গিয়েছেন উ ক্য জেন।
    বাংলাদেশে বড়ুয়ারা সংখ্যায় অনেক কম হলেও তারা কোথায় নেই? বড় বড় ডাক্তার, বড় বড় কর্মকর্তা, সবখানেই দেখতে পাই। তবে বর্তমানে তরুণ কিছু মারমা কর্মকর্তার সাক্ষাত পেয়েছি, যারা হবেন আমাদের আগামীর প্রতিনিধি। যাদের ওপর সমাজের আশা- প্রত্যাশা থাকবে অনেক।
    পিকনিকে মুন্ডি, লটারির বেচাবিক্রি হতে দেখলেও টেবিলে রাখা ছাত্রদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকা নিজ থেকে কাউকে কিনতে দেখিনি। আমিও যাওয়ার সময় আমার দুটি বইয়ের দুই-এক কপি নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম। না নিয়ে গিয়ে ভালোই করেছি। কেউ কিনতোই না। এতে আমার একটু হলেও মনটা খারাপ হতো।
    আগামীতে পিকনিক হলে আরো আনন্দময় করতে দুটি বিষয়ের বিবেচনা নেয়ার সুযোগ দেখেছি। যেমন খাবারে খুব বেশি খুশি হতে পারিনি। মুরগি মাংস খেতে গিয়ে মিষ্টি লেগেছে। আমরা আমাদের পাহাড়ি বাবুর্চিদের হারিয়ে ফেলেছি। সামাজিক সমাগমে নিজ থেকে অনেকে বাবুর্চিগিরি করতে নেমে যেতেন। পাহাড়ে যেখানে সে সুযোগ থাকার পরও বাহাদুরি দেখাতে, অন্যদের খুশি করাতে গিয়ে ভাড়া করা বাবুর্চি আনছি, সেখানে শহরের ব্যস্ত জীবনে কাউকে বাবুর্চি করার কথা বলতে পারি না। তবে আগামীতে পাহাড়ি বাবুর্চি দিয়ে রান্নার আয়োজন করার চিন্তা করতে পারি।
    খাবার সংস্কৃতির একটি অন্যতম উপাদান। মারমাকে ধরে রাখতে হলে, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোতে আমাদের বাবুর্চিগিরি প্রথাকেও ধরে রাখতে হবে। আমাদের অনুষ্ঠানে আমাদের কাপড় হলে, কেন আমাদের বাবুর্চি হবে না? তরুণরা ভেবে দেখতে পারে।
    পুরস্কারের কিছু আইটেম দেয়া হয়েছে প্লাস্টিকের সামগ্রী। যারা দারুণ লড়ে প্লাস্টিক সামগ্রী পেয়েছেন, নিশ্চয়ই খুশি হবেন না। সীমিত অর্থে সেই প্লাস্টিক সামগ্রীর দামে, আমরা ভালো মানের সাবান, ভালো মানের কলম, বই, পোস্টারের ব্যবস্থা করতে পারি।
    সকাল-বিকাল নাস্তা, নাস্তার আইটেম আমার পছন্দ হয়েছে। ছাত্রদের পক্ষে সব সময় এমন বড় বড় সমাগমের আয়োজন করা কঠিন। পিকনিকের ন্যায় ইভেন্ট করা কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। বার্ষিক পিকনিকের পাশাপাশি আমরা এলাকা ভেদে ছোট পরিসরে নিজেদের মধ্যে নানাভাবে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার দায়িত্ব নিতে পারি। যেমন ওয়ান ডিশ পার্টি। এমন আয়োজনে কোন ধরনের টাকা থাকবে না। সকলে একটি করে খাবার আইটেম নিয়ে যাবেন। সকলে ভাগাভাগি করে খাবেন। সাংগ্রাই পরবর্তী ১০-২০ পরিবার মিলে এমনটি আয়োজন হতে পারে। রাজী থাকলে আমি এ আয়োজনের দায়িত্ব নিতে পারি। এতে আমাদের যোগাযোগ বাড়বে। একে অপরের সর্ম্পক স্থাপন হবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের মাঝে সর্ম্পক তৈরি হবে।
    বন্ধু চিংসিং প্রু’র বক্তব্যে শুনেছি, বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানে নাকি ৩৭০জন কর্মী কাজ করছেন। এটি গর্বের। আমরা প্রত্যেককে যে যার অবস্থান থেকে গর্ব নিয়ে কিছু বলার কাজ রাখতে পারি। ডাক্তার হলে বলতে পারি, “আমি গত এক বছরে এত জনকে বিনামূল্যে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছি।” কিংবা “বিনামূল্যে পাওয়া ঔষধ অমুক প্রতিষ্ঠানকে, কলম খাতাগুলো অমুক স্কুলকে দিয়েছি।” আবার এনজিও কর্মীদের নানা মিটিং, ইটিং, সিটিং থাকে, সেও বলতে পারে, “আমি মিটিং এ পাওয়া কলম, খাতা, প্লাস্টিক ফাইলগুলো অমুক স্কুলে দিয়েছি” ইত্যাদি।
    আবার বিএমএসসি পিকনিক বলে ১০০% মারমা হতে হবে, মারমা পরিবারের অংশ হতে হবে সে থেকেও বেরিয়ে আসতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সহপাঠী পাওয়া যাবে যারা সকলের সাথে মেলামেশা করেন, মারমা ভাষা জানেন তাদেরও পিকনিকে, আনন্দের সঙ্গী হতে অনুরোধ করতে পারি। কারণ দিন শেষে আমরা সকলে পাহাড়ি, পাহাড়ই আমাদের ঠিকানা। মিলেমিশে থাকার চেষ্টাই হবে সেরা চেষ্টা।
    বিএমএসসি আয়োজিত ঢাকা কেন্দ্রিক বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছি। এবারও শহরে বসবাস করা শিক্ষিত চাকরিজীবি পরিবারের ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহন কম পেয়েছি। শহরের চাকরিজীবি ছেলেমেয়েরা ভর্তিসহ নানা কাজে শুধু চুপি চুপি সুবিধা নেয়। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে এদের দেখা পাওয়া যায় না।
    প্রতিবারে এড়িয়ে চলা, সে সব ছাত্রছাত্রীদের [পবিবারগুলোর] উপলব্ধি হওয়া জরুরী। মারমা বলেই কোটা পাচ্ছো, কোটা নিচ্ছো। যাদের গ্রামের ছেলেমেয়ে বলে, গ্রামের ছেলেমেয়েদের আয়োজনে তোমরা অংশগ্রহণ করো না, মনে রেখো, গ্রামের ছেলেমেয়েরাই আমাদের মরদেহ, তোমার আমার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ কাঁদে বহন করবে। শহর থাকা বন্ধুদের কেউ পুড়িয়ে দিয়ে আসবে না। গ্রামীন ছেলেমেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করতে শেখো, এতে তোমার গুরুত্ব কমবে না।
    শহরের ছেলেমেয়েদের বলতে চাই, দেখো তোমরা ঢাকা শহরে নামিদামি স্কুলে লেখাপড়া আর সারাদিন-রাত প্রাইভেট পড়ে, ভর্তির বেলায় ঠিকই কোটা নিয়ে ভর্তি হয়েছো, হচ্ছো। যদি সাহস থাকে, কোটা না নিয়ে গ্রামের এই ছেলেমেয়েদের জন্য ছেড়ে দিয়ে দেখাও। দেখো, গ্রামের স্কুলে পড়ালেখা করে, জুমিয়া পরিবারের সন্তান হয়েও ভালোভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। তাদের আয়োজন বলে তোমরা যারা এড়িয়ে যাচ্ছো, সমাজই তোমাদের একদিন এড়িয়ে যেতে পারে।
    এসো বন্ধুরা, আমরা এই কটা মারমা ‘মানু’ মাত্র! এত অহংকার রেখে কি হবে? মনে রেখো, অহংকার কেউ কেনে না। কোথাও বিক্রি হয়, হয়েছে বলেও শুনা যায় না। অহংকার তোমার জন্য এক প্রকার বোঝাই বাড়াবে। আগামী সামাজিক সমাগমে তোমাদের সকলের উপস্থিতি দেখা পাওয়ার প্রত্যাশা রাখছি।
    -ঞ্যোহ্লা মং, উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক। ইমেইলঃ nyohlamong@gmail.com

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

%d bloggers like this: