অনিয়ম-ধীরগতিতে স্থবির প্রকল্প, নির্মাণমান নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা দীর্ঘ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করার পরও প্রকল্পগুলোর ধীরগতি, নির্মাণে অনিয়ম এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে টেন্ডারের মাধ্যমে গাইন্দ্যা ও ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় তিনটি এবং রাজস্থলী সদর এলাকায় একটি—মোট চারটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রতিটি সেতুর ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১ থেকে ৩ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো কোনো প্রকল্পই পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় কাজ বন্ধ রেখে শুধুমাত্র শুষ্ক মৌসুমে—বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত—সীমিত আকারে কাজ পরিচালনা করে। ফলে প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। এতে করে সেতুগুলো ব্যবহার করতে না পারায় সাধারণ মানুষকে বিকল্প ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। শিক্ষার্থী, রোগী এবং কৃষিপণ্য পরিবহনকারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
নির্মাণাধীন সেতুগুলোর গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি—ব্যবহৃত রড দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় মরিচা ধরেছে, মরিচা পরিষ্কার না করেই কংক্রিট ঢালাই করা হয়েছে, অনেক স্থানে কংক্রিটে ফাটল দেখা যাচ্ছে
উন্নতমানের পাথরের পরিবর্তে স্থানীয় ‘চিংখ্যং ঝিরি’ থেকে সংগৃহীত নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এভাবে যদি কাজ করা হয়, তাহলে সেতুগুলো কতদিন টিকবে তা নিয়ে আমাদের বড় শঙ্কা রয়েছে। আমরা নিরাপদ যোগাযোগ চাই, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নয়।”

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সেতু নির্মাণে প্রকৌশল নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সেতুর পাইল ২০ ফুট গভীরে বসানোর কথা থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে মানা হয়নি,, সেতুর উচ্চতা সংযোগ সড়কের তুলনায় কম রাখা হয়েছে, রেলিং ও ব্লকের সংযোগস্থলে অসামঞ্জস্য রয়েছে
ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত দৈর্ঘ্যের অর্ধেক কাজ করা হয়েছে। এসব কারণে সেতুগুলোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আরও বাড়ছে।
চারটি সেতুর মধ্যে দুটি নির্মাণ করছে ‘ইসলাম অ্যান্ড ব্রাদার্স’ এবং বাকি দুটি ঠিকাদার এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরার প্রতিষ্ঠান।
ইসলাম অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আকাশ বণিক বলেন,
“দুর্গম এলাকা, শ্রমিক সংকট, লেআউট পরিবর্তন এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে।”
তবে নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। অন্যদিকে পাথর সরবরাহকারী সাবেক ইউপি সদস্য শিবুচান তঞ্চঙ্গ্যা তিনটি সেতুতে ঝিরির পাথর সরবরাহের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে এলজিইডি রাঙ্গামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী আহামদ শফি বলেন, চারটি সেতুর মধ্যে তিনটির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ঝিরির পাথর মূল সেতুতে নয়, ব্লকের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। চূড়ান্ত বিল প্রদানের আগে সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই সেতু প্রকল্পগুলো আর বিলম্ব না করে দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বছরের পর বছর কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে, যা এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও দৈনন্দিন যাতায়াতকারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে বিকল্প পথ না থাকায় অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
তাদের দাবি, শুধু দ্রুত কাজ শেষ করলেই হবে না—নির্মাণের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তদারকি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। কাজের প্রতিটি ধাপে প্রকৌশলী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাইয়ে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
এছাড়া, যেসব ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দায়িত্বে অবহেলা করেছে বা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম আবারও ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, রাজস্থলীর এই চারটি সেতু প্রকল্প কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের কারণে প্রকল্পগুলো এখন প্রশ্নবিদ্ধ। দ্রুত কাজ সম্পন্নের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে এই সেতুগুলোই একসময় বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।


















