শনিবার , ২৩ মে ২০২৬ | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রম বৃদ্ধি: অস্ত্র উদ্ধার, আধিপত্যের সংঘাত ও নিরাপত্তায় উদ্বেগ

প্রতিবেদক
বিশেষ প্রতিবেদক
মে ২৩, ২০২৬ ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের খাগড়াছড়ি অংশে সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনা, অভ্যন্তরীণ সংঘাতে প্রাণহানি এবং বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব সব মিলিয়ে পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।খাগড়াছড়ি জেলায় সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপস্থিতি এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ও শঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ে সক্রিয় বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, এলাকা দখল এবং সদস্য সংগ্রহকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এসব প্রতিযোগিতা মাঝে মাঝে রূপ নিচ্ছে সহিংস সংঘর্ষে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।

গত ১০ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার বৌদ্ধমনিপাড়ায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ৩ বিজিবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, “বৌদ্ধমনিপাড়া বিওপির নায়েব সুবেদার মোঃ শাহআলমের নেতৃত্বে একটি টহলদল দূর্গম বৌদ্ধমনিপাড়া এলাকার কাঠালতলী যাত্রী ছাউনি এলাকায় অবস্থান নেয়। সে পথে বিকাল ৪টার দিকে সীমান্ত সড়ক দিয়ে দুটি মোটরসাইকেলে চারজন ব্যক্তি ওই এলাকায় প্রবেশ করে। এসময় বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজনরা মোটরসাইকেল ফেলে দ্রুত পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১,৪০০ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এদিকে উদ্ধারকৃত গোলাবারুদ বিওপিতে নিয়ে আসার পথে শতাধিকের অধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বিজিবির টহলদলকে ঘেরাও করার চেষ্টা করে। পরে বিজিবি পানছড়ি ব্যাটালিয়ন সদর থেকে আরো বিজিবি প্রবেশ করলে তারা সড়ে দাঁড়ায়।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাং ইউনিয়নের বাবুরাপাড়া ও করল্যাছড়িতে গত ২১ মে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত খীসা) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সশস্ত্র দু’পক্ষের মধ্যে এ গোলাগুলি হয়। গুলাগুলি খবর পেয়ে বাবুরাপাড়া ও করল্যাছড়িতে পৃথক দুটি অভিযান চালায় সেনাবাহিনীর খাগড়াছড়ি রিজিয়নের সেনা সদর জোন। এ সময় সন্ত্রাসী’রা সেনাবাহিনীর টহল দলকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে সেনাসদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা ফায়ার করে। পরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল তল্লাশি চালিয়ে ১টি চায়না রাইফেল, ২৭৪ রাউন্ড গোলাবারুদ, ২টি এফসিসি এবং অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করে।

গত ১৬ মে রামগড়ের বুদংছড়া এলাকায় ইউপিডিএফ এর সদস্যরা অবস্থান করার খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে এসময় ৩ জন’কে আটক করে। আটককৃত’রা হলেন, রামগড় যৌথখামার এলাকার রাজু মারমা (১৮), ছোট খেদা এলাকার সুইথোয়াই মারমা (৩৫) ও সিন্তকছড়ির রনেল চাকমা ওরফে মন্টু চাকমা(২৬)। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি AK-22 রাইফেল, পাঁচ রাউন্ড তাজা গুলি, ওয়াকিটকি, একটি ম্যাগাজিন ও চাঁদা আদায়ের রশিদ উদ্ধার করা হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র উদ্ধার কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বৃহত্তর নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতার একটি ইঙ্গিত। কারণ কোনো এলাকায় অস্ত্র মজুত থাকার অর্থ হলো সেখানে সংগঠিত সশস্ত্র নেটওয়ার্ক কাঠামো সক্রিয় রয়েছে। যখন কোনো এলাকায় ধারাবাহিকভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়, তখন সেটি বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করতে হয়। কারণ অস্ত্র নিজেরা আসে না; এর পেছনে সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের একটি চক্র থাকে।”

পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একই অঞ্চলে সক্রিয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদা আদায় নিয়ন্ত্রণ, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে। এর জেরে সংঘটিত হচ্ছে হামলা, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড।

যখন কোনো এলাকায় একাধিক সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয় থাকে, তখন তাদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাহাড়েও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। গত কিছু সময়ের ঘটনায় লক্ষ্য করা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সশস্ত্র সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনাকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের ফল বলে উল্লেখ করেছেন। যেসব সংগঠন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়, তাদের মধ্যে আধিপত্যের প্রশ্নে সংঘাত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এর বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। এসব সংঘর্ষের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অনেকে নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতেও অনীহা দেখান।

পানছড়িতে ১৪০০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার বিষয়টি কি আসলে সহজভাবে দেখার সুযোগ আছে?

১০ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি অভিযান চালিয়ে ১৪০০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এ ঘটনাও পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। এত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে।কারা এসব মজুত করছিল, কী উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল এবং কীভাবে এসব সরবরাহ করা হচ্ছিল?

গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জেরও ইঙ্গিত দেয়। পাহাড়ি অঞ্চলে গোলাবারুদের উপস্থিতি দেখায় যে অস্ত্রের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থাও সক্রিয় থাকতে পারে। কারণ অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা ধরে রাখতে গোলাবারুদ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুর্গম এলাকা এবং সীমান্তের জটিল ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে।

সশস্ত্র কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। স্থানীয়দের অভিযোগ, সহিংসতা ও সংঘাতের আশঙ্কা থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও প্রভাবিত হতে পারে।

পাহাড়ের অনেক মানুষ মনে করেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ কোনো এলাকায় স্থায়ী উন্নয়নের জন্য নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তাহীনতা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিনিয়োগ, পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলমান থাকলেও চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। অস্ত্র উদ্ধার বা অভিযানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কিছু সাফল্য এলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বড় বিষয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অভিযান নয়; পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা, সীমান্ত নজরদারি জোরদার, স্থানীয় জনগণের আস্থা বৃদ্ধি এবং টেকসই সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একটি বহুমাত্রিক বিষয়। এখানে কেবল আইনশৃঙ্খলা নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর অস্ত্র উদ্ধার, পানছড়িতে ১৪০০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাগুলো আবারও দেখিয়ে দিয়েছে পাহাড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পদক্ষেপ, স্থানীয় বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: