বৃহস্পতিবার , ১৩ আগস্ট ২০২৬ |
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’: আইনগত স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক

প্রতিবেদক
বিশেষ প্রতিবেদক
আগস্ট ১৩, ২০২৬ ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে ‘আদিবাসী’, ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ এই তিনটি পরিভাষা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক চলে আসছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, লুসাইসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তবে এই স্বাচ্ছন্দ্যবোধের আড়ালে পাহাড় নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়ছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নথি ও আইনে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘জাতিসত্তা’ বা ইংরেজিতে ‘tribes, minor races, ethnic sects and communities’ ধরনের পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের আইনে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের বৈধতা কতটুকু, আর ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ পরিচয়ের আইনগত ভিত্তিই বা কী?

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ‘tribes, minor races, ethnic sects and communities’-এর অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর আলাদা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি সংবিধান স্বীকার করে। তবে একই অনুচ্ছেদে ‘indigenous peoples’ বা ‘আদিবাসী জনগণ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। ফলে বর্তমান সাংবিধানিক ভাষায় ‘আদিবাসী’ নামে পৃথক কোনো সাংবিধানিক শ্রেণির স্বীকৃতি নেই এ কথা বলা যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। বরং সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদেই তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০। আইনটির উদ্দেশ্যই হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা। এই আইনের ২(২) ধারার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’। ব্যবহারিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার বাংলাদেশের আইনে ‘আদিবাসী’ শব্দটি একেবারেই নেই বা শব্দটি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি পরিভাষা। ২০১০ সালের আইনটির অধীনে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পৃথক সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটও এই আইনের কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। ফলে রাষ্ট্রীয় আইনগত ব্যবহারে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ একটি নির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিভাষা। তবে একই আইনের সংজ্ঞায় ‘আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দবন্ধ থাকায় দুই পরিভাষার মধ্যে বাস্তব ও আইনগত সম্পর্কও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। এ কারণে এই অঞ্চলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো বিদ্যমান। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আইনি কাঠামো এর উদাহরণ। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিও এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলো পাহাড়ের জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের বাইরে কোনো পৃথক রাষ্ট্রীয় পরিচয় দেয় না। বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ বাস্তবতা ও অধিকারকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

পরিচয়ের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হয় আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রীয় পরিভাষার মধ্যে। একটি জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক কারণে নিজেদের যে নামে পরিচয় দিতে চায়, সেটি তাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। অন্যদিকে রাষ্ট্র যখন আইন তৈরি করে, তখন প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রয়োজনে নির্দিষ্ট পরিভাষা নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ রাষ্ট্রীয় আইনে সুস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হলেও ‘আদিবাসী জনগণ’ নামে পৃথক সাংবিধানিক শ্রেণি তৈরি হয়নি।

আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘Indigenous Peoples’ একটি বহুল ব্যবহৃত পরিভাষা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি, ভূমি, ভাষা ও আত্মপরিচয়ের বিষয় নিয়ে আলাদা কাঠামোতে আলোচনা করে। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক পরিভাষা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবহৃত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সংবিধানের শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়ে যায় না। বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় বর্তমানে ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত ‘tribes, minor races, ethnic sects and communities’ পরিভাষাই প্রাসঙ্গিক। সংবিধানের সরকারি পাঠেও এই ভাষাই রয়েছে।

এ কারণে ‘বাংলাদেশের সংবিধান পাহাড়ের জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে’ এমন বক্তব্য বর্তমান সাংবিধানিক ভাষার সঙ্গে সরাসরি মেলে না।

‘আদিবাসী’ বনাম ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বিতর্ক মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথমটি হলো আত্মপরিচয় কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের কী নামে পরিচিত করবে। দ্বিতীয়টি হলো রাষ্ট্রীয় পরিভাষা সংবিধান ও আইনে কোন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয়টি হলো আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার কাঠামো যেখানে ‘indigenous peoples’ শব্দের একটি বিশেষ অর্থ রয়েছে।

এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ‘আদিবাসী’ শব্দটি সামাজিক বা আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সংবিধানে ওই নামে পৃথক কোনো সাংবিধানিক শ্রেণি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ রাষ্ট্রীয় আইনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আত্মপরিচয় অস্বীকার করেনি।

বাংলাদেশের বর্তমান আইন ও সংবিধান পর্যালোচনায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে ‘আদিবাসী জনগণ’ নয়, ‘tribes, minor races, ethnic sects and communities’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়তটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ এর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংজ্ঞায় ‘বিভিন্ন আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর জনগণ’ বলা হয়েছে। ফলে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বাংলাদেশের আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তৃতীয়ত, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ভূমি ও স্থানীয় প্রশাসনের বাস্তবতাকে বিবেচনা করে। এসব ব্যবস্থা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যকর থেকেই দেশ পরিচালনা করা হয়।

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: