স্বপ্ন ছিল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন শেষে গর্বের সঙ্গে বাড়ি ফিরবেন ট্রোম্যান খীসা। ফেরার পথে সন্তানের জন্য নিয়ে আসবেন সাইকেল। আর ফিরে এসে প্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে সাজাবেন নিজেদের ছোট্ট ঘর। অথচ একটি দূর্ঘটনায় সব মাড়িয়ে তার নিথর দেহ ফিরে এলো এম্বুলেন্সে চড়ে পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায়।
গত ২০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েন বাংলাদেশ ফোর্স মেরিটাইম ইউনিট ব্যানএফএমইউ-১১-এ দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ভারতীয় ফিল্ড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। শান্তিরক্ষা মিশন শেষে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও সেই ফেরা হলো নিথর দেহে।

আজ (সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর) রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার নিজ গ্রাম রামহরি পাড়ায় বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি ও যথাযোগ্য সামরিক মর্যাদায় সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। এ সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি দল গার্ড অব অনার প্রদান করে তাকে। পরে মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শেষ শ্রদ্ধা জানান স্বজন, সহকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা।
এর আগে বুড়িঘাট এলাকায় মরদেহ পৌঁছালে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ভিড় করেন স্বজন, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। ধর্মীয় গুরুদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা। প্রার্থনায় অংশ নেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা। পরে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি ও প্রথা অনুযায়ী তাঁর শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতার আগে তাঁর স্ত্রী শ্রেয়া চাকমার হাতে তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও জাতিসংঘের পতাকা, ক্যাপ এবং মেডেল। এসময় সরকারের কাছে দুই কন্যা সন্তানকে বড় করতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি একটি সরকারি চাকরির দাবি জানান ট্রোম্যান খীসার স্ত্রী।
তিনি জানান কান্না ছাড়া এখন আর কিছুই নেই। দুই মেয়েকে নিয়ে এখন কী করব বুঝতে পারছি না। নৌবাহিনী যা করছে এ জন্য আমি নৌবাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞ। রেশন ও বাচ্চাদের স্কুলের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমার একটাই চাওয়া দুই মেয়েকে মানুষ করার জন্য যদি একটি চাকরির ব্যবস্থা করা হয় তাহলে ভালো হয়।
নিহত নৌ-সদস্য ট্রোম্যান খীসার পিতা সুবিমল খীসা বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে আমার ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে এ জন্য আমি গর্বিত। তবে সরকারের কাছে আমার কিছু দাবি আছে। আমি বৃদ্ধ মানুষ এখন আর কাজকর্ম করতে পারি না। আমার ছেলে আমাকে দেখাশোনা করত। প্রতি মাসে বাজার,ওষুধপত্রসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু এনে দিত। এখন আমার ওষুধগুলো আমি কার কাছে পাব? সরকার কি আমার ওষুধের ব্যবস্থা করবে? সরকারের কাছে আমার আবেদন, আমাকে বাঁচতে হবে। নিয়মিত ওষুধ না খেতে পারলে আমি মারা যাব।
উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার রামহরি পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ট্রোম্যান খীসা। ২০০৬ সালের ১ জুলাই নাবিক হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ট্রোম্যান খীসার অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে বিশেষ প্রতিনিধি ও দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান।


















