সোমবার , ৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৩শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

অন্ধকারে বন্দি রাজস্থলীর চুশাক পাড়া: বিদ্যুৎ-নেটওয়ার্কহীন গ্রামে থমকে আছে জীবন

প্রতিবেদক
উচ্চপ্রু মারমা, রাজস্থলী, রাঙামাটি
জানুয়ারি ৫, ২০২৬ ৯:৪৯ অপরাহ্ণ

রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ চুশাক পাড়া গ্রাম যেন উন্নয়নের মানচিত্রে এক অদৃশ্য নাম। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও আজও গ্রামটিতে পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো, নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক, আর যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশায় নিত্যদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শতাধিক পরিবারকে।

সড়েজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, কাঁচা ও ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে গ্রামটিতে যেতে হয় জীবন ঝুঁকি নিয়ে। বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কাদামাখা পাহাড়ি পথে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই যাতায়াত আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অনেক সময় অসুস্থ রোগী কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বাজারে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

দীর্ঘদিন ধরে রাস্তাগুলোর উন্নয়ন ও সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই দুর্ভোগ ফিরে আসে, অসুস্থ রোগী, অন্তঃসত্ত্বা নারী কিংবা জরুরি প্রয়োজনে কাউকে উপজেলা সদরে নিতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তির শিকার হতে হয় এলাকাবাসীকে।

চুশাক পাড়া গ্রামে আজও বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি। সন্ধ্যা নামলেই পুরো গ্রাম ডুবে যায় অন্ধকারে। হারিকেন, কুপির আলো কিংবা সোলার আলো। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ আসবে বলে—এই আশায় দিন, মাস, এমনকি বছর কেটে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “বিদ্যুতের আলো দেখার স্বপ্ন বুকের ভেতর নিয়েই অনেক বয়স্ক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন।”

বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রাতে পড়তে বসা শিশুদের চোখ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। ছোট ব্যবসা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ।

নেই নেটওয়ার্ক, বিচ্ছিন্ন এক জনপদ ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে দাঁড়িয়ে, সরকারি-বেসরকারি কোনো সেবারই সঠিক তথ্য তারা পান না। অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল সেবা কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং থেকে চুশাক পাড়া গ্রামে নেই কোনো সেবা। নেটওয়ার্ক না থাকা ফোনে কথা বলা তো দূরের কথা, জরুরি মুহূর্তে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করাও অসম্ভব। অসুস্থ রোগীর অবস্থা জানাতে কিংবা সাহায্য চাইতে হলেও পাহাড় পেরিয়ে দূরের এলাকায় যেতে হয়।

এলাকার সড়কগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের চলাচল এখন ভীষণ কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হাট-বাজারে যাতায়াত করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়, কোথাও কোথাও বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় হাঁটা কিংবা যানবাহনে চলাচল দুটোই হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল হাটে নিয়ে যেতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। কাঁধে বা মাথায় করে পণ্য বহন করতে গিয়ে অনেককে পড়ে যেতে দেখা যায়। আবার যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সময়মতো পৌঁছানো যায় না, ফলে ন্যায্য দামে পণ্য বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অনেক সময় চালকরা রাস্তার ভাঙা অংশ বুঝতে না পেরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, এতে ঘটছে গাড়ি উল্টে যাওয়া কিংবা মুখোমুখি সংঘর্ষের মতো ঘটনা। এতে চালক ও যাত্রীদের পাশাপাশি পথচারীরাও আহত হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তাগুলোর যথাযথ সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দ্রুত টেকসই সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা নাগরিক হয়েও নাগরিক সুবিধা পাই না। রাস্তা ভালো না থাকায় আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারি না। এতে ন্যায্য দাম থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি।”

খই খই সাইং মারমা (টেবিল টেনিস খেলোয়াড়) বললেন, আমি যখন দেশের বাইরে গিয়ে খেলি, তখন সবাই জানতে চায়—আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু গ্রামে ফিরলে মনে হয় আমরা এখনও অনেক পেছনে পড়ে আছি। চুশাক পাড়ায় আজও বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্ক নেই। সন্ধ্যা হলেই পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা, খেলাধুলার,সবকিছুতেই ভীষণ সমস্যা হয়। মোবাইল চার্জ দেওয়া থেকে শুরু করে জরুরি যোগাযোগ—সবই কষ্টের।”

তিনি আরো বলেন, আমি চাই আমার গ্রামের ছেলে-মেয়েরাও যেন সুযোগ পায়। বিদ্যুৎ আর নেটওয়ার্ক থাকলে ওরাও স্বপ্ন দেখতে শিখবে, আমি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে পারছি, কিন্তু আমার গ্রাম এখনও অন্ধকারে—এটা আমাকে কষ্ট দেয়।”

উনুমং মারমা কারবারি বলেন, চুশাক পাড়া আজও বিদ্যুৎবিহীন। সরকার অনেক উন্নয়নের কথা বলে, কিন্তু আমাদের গ্রামে আলো পৌঁছেনি রাতে চিকিৎসা জরুরি হলে মোমবাতির ও টর্চ লাইট নিয়ে পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। নেটওয়ার্ক না থাকায় কাউকে খবর দেওয়াও যায় না, শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারে না। বিদ্যুৎ না থাকায় টিভি, ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা—সবই আমাদের কাছে কেবল স্বপ্ন।”

প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি, চুশাক পাড়ার বাসিন্দারা দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন ও রাস্তা সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত না হলে পাহাড়ি এই জনপদের মানুষের জীবনমান কোনোভাবেই উন্নত হবে না।

এলাকাবাসী আরও বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় যেন দুর্গম গ্রামগুলোকে অবহেলা না করা হয়। চুশাক পাড়ার মানুষও দেশের নাগরিক—এই উপলব্ধি থেকেই প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন তারা।

চুশাক পাড়া গ্রাম আজও অপেক্ষায়—আলো আসবে, রাস্তা হবে, যোগাযোগ সহজ হবে। উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত হওয়ার এই অপেক্ষা আর কত দীর্ঘ হবে, সেই প্রশ্নই এখন পাহাড়ি এই জনপদের মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে।

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: