দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে মানবিক উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মহালছড়ি জোন। মানবিক এই কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন কার্যক্রমে নতুন করে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন ৮৪ জন পাহাড়ি অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।
মহালছড়ি জোনের উদ্যোগে গত ৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে আয়োজিত বৃহৎ বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পেইনে প্রায় ১ হাজার ২৫ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ১২৭ জনকে ছানি অপারেশনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। এছাড়া প্রায় ১০০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চশমা এবং সকল রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে আরও ৬০ জনকে বিনামূল্যে চশমা বিতরণ করা হয়।

ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় ধাপে ছানি অপারেশনের জন্য আগ্রহী রোগীদের মধ্যে বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ৬ জুন ২০২৬ তারিখে মহালছড়ি জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ১০৬ সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে যাত্রা করে। এ দলে ৮৪ জন ছানি রোগী এবং ২২ জন সহায়ক উপস্থিত ছিলেন। রোগীদের মধ্যে ৪৫ জন নারী ও ৩৯ জন পুরুষ ছিলেন। এছাড়া ৪৪ জন বাঙালি এবং ৪০ জন বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন।
রোগীদের যাতায়াত, আবাসন, চিকিৎসা সমন্বয় ও নিরাপত্তাসহ সম্পূর্ণ কার্যক্রম মহালছড়ি জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ আল জাবির আসিফ, পিএসসি-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
দুর্গম এলাকা থেকে আগত রোগীদের সুবিধার্থে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি যাত্রাপথে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়।
চট্টগ্রামের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রোগীদের বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষার পর ৮৪ জনের মধ্যে ৭৬ জনকে তাৎক্ষণিক অপারেশনের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বাকি রোগীদের পরবর্তীতে অপারেশনের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ৭ জুন নির্বাচিত রোগীদের সফলভাবে ছানি অপারেশন সম্পন্ন হয়।
অপারেশনের পর রোগীদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা তদারকি ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহালছড়ি জোনের একটি সেনা দল নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে। সুস্থ হয়ে নতুন করে পৃথিবী দেখার আনন্দে অনেক রোগী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন পর স্পষ্টভাবে দেখতে পেরে তাদের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি, আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার হাসি।
এ বিষয়ে মহালছড়ি জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ আল জাবির আসিফ, পিএসসি বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের নিরাপত্তাই নয়, মানুষের কল্যাণেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলের যেসব মানুষ আর্থিক সংকট ও চিকিৎসা সুবিধার অভাবে বছরের পর বছর চোখের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অসহায় মানুষের জীবনে নতুন আলো ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা গর্বিত।
মহালছড়ি জোনের (আরএমও) ক্যাপ্টেন মোঃ বোরহান উদ্দিন বায়োজিদ বলেন,ছানি একটি নিরাময়যোগ্য সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা পেলে একজন মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। আমরা রোগীদের প্রাথমিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে অপারেশন ও পরবর্তী চিকিৎসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। ভবিষ্যতেও জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে সকল রোগী ও তাদের সহায়তাকারীদের নিরাপদে নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। রোগীদের হাসিমুখ, নতুন করে জীবনকে দেখার উচ্ছ্বাস এবং পরিবারের সদস্যদের আনন্দ যেন পুরো উদ্যোগের সার্থকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনসেবার অনন্য সমন্বয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচি পাহাড়ের মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মহালছড়ি জোনের এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।


















