পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক অনন্য ভূখণ্ড। পাহাড়, ঝরনা, বন আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে এ অঞ্চলকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘সবুজ ভূস্বর্গ’। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে অস্থিরতা, সহিংসতা ও অনিরাপত্তার এক গভীর বাস্তবতা। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ে এখনো থামেনি অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝানি, খুন, গুম ও অপহরণের মতো গুরুতর মানবতা বিরোধী অপরাধ।
বর্তমানে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ তিন জেলায় অন্তত চারটি সশস্ত্র সংগঠনের সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে দিন দিন। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এসব সংগঠনের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটে, যার শিকার হচ্ছে নিরীহ সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগের পাহাড়ও বেশ বড়, পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত কোথাও নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ঘটনাগুলো এই অস্থিরতার বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই মাসেই রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের গবঘোনা গ্রামের বাসিন্দা মৃত সোনাধন চাকমার ছেলে সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তার কে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন নিউটন চাকমা।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার ধারাবাহিক অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি।
এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তৎকালীন শান্তি বাহিনীর সদস্যরা গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দেন। তবে শান্তির সেই প্রত্যাশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একই দিনে শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা।
পরবর্তীতে তার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সময়ের সাথে সাথে মূল সংগঠনগুলো ভেঙে আরও উপদলে বিভক্ত হয়। বর্তমানে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস (এমএন লারমা) এবং ইউপিডিএফ ও ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামে চারটি সশস্ত্র সংগঠন পাহাড়ে সক্রিয়।
এই সংগঠনগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্যের চেয়ে আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বার্থই সংঘাতের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের দাবি, চাঁদাবাজি এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। পাহাড়ে ব্যবসা, পরিবহন, উন্নয়ন প্রকল্প সবকিছুতেই দিতে হচ্ছে ‘চাঁদা’। অভিযোগ রয়েছে, বছরে প্রায় ৭শ’ কোটি টাকারও বেশি অর্থ এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে যাচ্ছে চাঁদার মাধ্যমে।
একটি অনানুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বলছে, শান্তিচুক্তির পর গত প্রায় গত ২৯ বছরে সহস্রাধিক মানুষ খুন হয়েছেন এবং অন্তত ১৫শ’ জন গুম হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক কর্মী, সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তা। অপহরণও একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এখন অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ এই মাসের ৮ই মার্চ খাগড়াছড়ি থেকে মোঃ রফিকুল ইসলাম নামের এক যুবক নিখোঁজ হন, যার এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি পাহাড়ের মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন শান্তিচুক্তির এত বছর পরও কেন এই অনিশ্চয়তা? কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের সেই প্রত্যাশিত শান্তি?বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি হলো শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অভাব। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, শরণার্থী পুনর্বাসন, আঞ্চলিক পরিষদের কার্যকর ক্ষমতা এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। ফলে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ রয়ে গেছে, যা নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে।
অন্যদিকে পাহাড়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সীমান্তবর্তী অবস্থান এবং বিচ্ছিন্ন বসতির কারণে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক অপরাধই থেকে যায় দৃষ্টির আড়ালে।
তবে হ্যাঁ শুধুমাত্র নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শান্তিচুক্তির অবশিষ্ট ধারাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, সংলাপের পরিসর বাড়াতে হবে। চুক্তির বাইরে থাকা সংগঠনগুলোকে আলোচনার আওতায় এনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। সহিংসতার পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ। আর এ-সব করতে হবে নিরাপত্তা বাহিনীকে সাথে নিয়ে। তা না হলে পাশ্ববর্তী দেশ গুলোর ইন্ধনেই পাহাড় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এখন পাহাড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোরদার করা জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারলে তরুণদের সশস্ত্র পথে ঝুঁকে পড়া কমবে। উন্নয়ন বঞ্চনা অনেক সময় সংঘাতকে উসকে দেয় এ বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চাঁদাবাজি ও অপহরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে এই অপরাধগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্প্রীতি। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে দূরত্ব ও অবিশ্বাস রয়েছে, তা দূর করতে সামাজিক উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপ বাড়াতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় এসেছে, সকল পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগে এই অশান্ত পাহাড়কে সত্যিকারের শান্তির আবাস ভূমিতে পরিণত করার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করে পাহাড়ের প্রতিটি অবৈধ জায়গা চিহ্নত করে। সশস্ত্র সংগঠন গুলোের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন জুরুরি।


















