পরিবেশ আইনে পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের নাপিতখালীতে রাতের অন্ধকারে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে একটি চক্র। এসব মাটি স্থানীয় মানুষের বসতভিটা ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন স্থানীয় নুরুল হক প্রকাশ “হক সিন্ডিকেট “। এদের সঙ্গে বনবিটের কিছু অসাধু ব্যক্তি মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাই চক্রটি রাতের অন্ধকারে পাহাড় কেটে সাবাড় করছে।
পাশাপাশি পাহাড়ে থাকা মূল্যবান প্রজাতির গাছও সাবাড় করছে এ চক্রটি। তবে নানা অজুহাতে হাত গুটিয়ে আছেন বনবিভাগের কর্মকর্তারা। দিনের পর দিন ডাম্পারের সাহায্যে পাহাড় কেটে সাবাড় করলেও এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেননি তারা।
ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের নাপিতখালী বিটের অধিন হাজিপাড়া পুর্ব বোয়ালখালীস্থ বশরত আলীর বসতভিটা ও একই এলাকার কাদেরের পাহাড়ে চলছে এ নিধন যজ্ঞ।
জানা গেছে, হক সিন্ডিকেট নামে পাহাড় কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইসলামপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড ভিলেজারপাড়ার মৃত খলিলুর রহমানের পুত্র নুরুল হক (৪৫) প্রকাশ ডাম্পার নুরুল হক। তার ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসাবে কাজ করছেন
ইসলামাবাদ ইউনিয়নের পুর্ব বোয়ালখালী গ্রামের মৃত বশরত আলীর পুত্র নুরুল হক (৩৮)। তাদের সঙ্গে নাপিতখালী বিটের স্টাফও রয়েছেন।
প্রতিরাতে মাটি কেটে ডাম্পার ট্রাকের মাধ্যমে স্থানীয় ভিটে-পুকুর ভরানোর কাজে সরবরাহ করছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে তারা পাহাড় কাটছেন।এদিনে সরকারি অফিস আদালত বন্ধ থাকায় তাদের ধরাপড়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই তারা এ সময়কে নিরাপদ ধরে নিয়ে পাহাড় কাটার কর্মযজ্ঞ এগিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, বনবিভাগ নামেমাত্র অভিযান চালায়। তাদের কিছুই করেনা। ‘গা বাঁচাতে’ মামলা করে দায় সারে কর্মকর্তারা। তাদের ধরতে বললে দেখিয়ে দিলে তারা নানান অজুহাত দেখান। মুলত পাহাড়খেকো নুরুল হক সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলেমিশে বিট অফিস পরিচালনা করেন কর্মকর্তারা।
তবে অভিযুক্ত নুরুল হক বলেন, আমিতো মাটির ব্যবসা করি না। তবে আমার তিনটি ডাম্পার গাড়ি রয়েছে। এজন্য পাহাড় কাটার সাথে আমি জড়িত আছি ভাবছে। প্রকৃতপক্ষে আমি পাহাড় কাটার সাথে জড়িত নই। কারা কাটছে সেটাও আমি জানি না।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, নাপিতখালীতে যেভাবে বনের পরিবেশ ধ্বংস করছে বর্তমান বিট কর্মকর্তা। তেমনি ভাবে হক সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে পাহাড়ি গাছ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা অবৈধ উপার্জন করে যাচ্ছে। নাপিতখালী বিট কর্মকর্তাকে টাকা দিলেই মিলে সরকারি জায়গা, বালু এবং বনের গাছ। তাছাড়া জোয়ারিয়ানালা বিটে দায়িত্ব পালনকালে পাহাড়ি টিলা গাছ শূন্য করেছে মর্মে অভিযোগও রয়েছে ওই বিট কর্মকর্তা কুদ্দুস প্রকাশ মিড়া কদুর বিরুদ্ধে। একই সাথে ফুলছড়ি রেঞ্জ এর নাপিতখালী বিটের পশ্চিম গজালিয়া এলাকার জঙ্গল খুটাখালী মৌজার প্রায় ৮০ শতক সংরক্ষিত বনভূমি বিগত বছরের ৭ মে জবরদখল প্রতিরোধ করে সহকারী বন সংরক্ষকের নেতৃত্বে বিভিন্ন বনজ, ঔষধি ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির চারা রোপণ করা হয়। সম্প্রতি রেঞ্জ অফিসারকে ম্যানেজ করে ঐ জমি দখল করে বাউন্ডারি দিয়ে প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে মোক্তার নামের এক ভিলেজারের সহযোগিতায়।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হক সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে সরকারি গাছ বিক্রি ও পাহাড়ি জায়গা অবৈধ দখল দিয়ে বিট কর্মকর্তা কুদ্দুস ও বিট অফিসের লোকজন লাখ লাখ টাকা অবৈধ ভাবে উপার্জন করলেও যেন দেখার কেউ নেই। কিন্তু ৪০/৫০ বছর যাবত দখলে থাকা লোকজন তাদের এহেন কাজে বাঁধা দিলে উচ্ছেদের হুমকি ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও করেন সচেতন মহল। এই বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্ত বিট কর্মকর্তা কুদ্দুস, ডাম্পার নুরুল হক ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড নুরুল হকসহ জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে বন বিভাগের উর্ধতন কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয়রা।
মোবাইল ফোনে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্তব্য না করে কল কেটে দেন হক সিন্ডিকেটের সেকেন্ড ইন্ড কমান্ড নুরুল হক। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যপারে নাপিতখালী বিট কর্মকর্তা কাম ফুলছড়ি রেঞ্জ অফিসার ( ভারপ্রাপ্ত) কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বিটে জনবল স্বল্পতার কারণে শক্তিশালী হক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।
এসময় বিটের সরকারি জায়গা ঘর নির্মাণ ও গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই এগুলো অনেক আগের ঘটনা, এখন এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলে লাভ নাই। লাইন দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেননি, অফিসে দেখা করার অনুরোধ করেন।
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ মারুফ হোসেন বলেন, এবিষয়ে বিস্তারিত লিখে পাঠান, তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, পাহাড় কাটা পরিবেশ আইনে স্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ নষ্ট হয় এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। ফলে ঘটে মারাত্মক ভূমিধস।
তিনি বলেন, নাপিতখালীতে পাহাড় কাটার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


















