দেশের গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চল বহু বছর ধরে অস্থিরতা, অবিশ্বাস, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সহিংসতার এক জটিল মহা সমীকরণ নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় তিন দশক আগে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও আজও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সময়-অসময়ে সংঘর্ষ, হত্যা, অপহরণ, গুম চাঁদাবাজির এক অভয়ারণ্য রুপ নিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে পাহাড়ে আজও কেন শান্তি অধরা?
সংঘাতের পেছনের ইতিহাস:
পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একাংশ তাদের স্বায়ত্তশাসন, ভূমির অধিকার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার তথাকথিত দাবি তুলে। এই দাবি ঘিরেই ১৯৭০ এর দশক হতে দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর ভয়াবহ স্টিমরোলার চালায় সশস্ত্র সংগঠন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে সরকারের বাহিনীর উপর হামলা চালায় ক্ষতিগ্রস্থ হয় পাহাড়ের বাঙালী অধীবাসিরা। নিজেদেরও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চলে সংঘর্ষ চলে হত্যা, গুম, খুন ও অপহরণ। এ সময় বহু মানুষ প্রাণ হারায়, অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং পুরো অঞ্চল দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পাহাড়ি নেতৃত্বের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির মাধ্যমে আশা করা হয়েছিল, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। তবে সেই শান্তির বাতাস চোখে দেখেনি পাহাড়ের মানুষ।
শান্তি চুক্তির আকাঙ্ক্ষা কি ছিলো:
শান্তি চুক্তির লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর করা। চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে ক্ষমতা প্রদান, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ভূমি কমিশন গঠন, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার সবই বাস্তবায়ন করেছে সরকার। যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাহাড়ে নতুন এক আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের নতুন যুগ শুরু হবে। তবে সেটি এখন অনেকটা ভঙ্গুর হয়ে আছে পাহাড়ের বাস্তবতায়।
পাহাড়ে নিরাপত্তা ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ কোথায়?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, চুক্তির সব ধারা বাস্তবায়ন হলেও কথা রাখেনি স্বশস্ত্র সংগঠন জেএসএস। অনেক বিশ্লেষকের মতে, চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন পাহাড়ে অসন্তোষের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনও পুরোপুরি সুগম হয়নি। পাহাড়ে সরকার তার চুক্তির সকল ধাপ পূরনের পথে থাকলে কথা রাখেনি চুক্তিকারীরা। তারা নানা সময়ে পাহাড়‘কে উত্তাপ্ত করে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে পাহাড়কে এক সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে রেখেছে।
রাজনৈতিক বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব:
শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ি রাজনীতিতেও বিভক্তি তৈরি হয়। একাধিক সংগঠন ও গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলে কখনো কখনো সংগঠন গুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার‘কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ আর হত্যায় মেতে উঠে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আধিপত্য ও মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সংঘাতময় পাহাড় অবিশ্বাস ভরপুর:
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আরেকটি বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও সহিংসতার কারণে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবিশ্বাস অনেক সময় ছোট ঘটনাকেও বড় সংঘর্ষে রূপ দিয়ে আসছে যার ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, সামাজিক আস্থাও গড়ে তোলা জরুরি।
উন্নয়ন ও বাস্তবতার প্রশ্ন:
সরকার পার্বত্য অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নতুন সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যটন উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কিছুর পরেও পাহাড়ে শান্তির পথে সংলাপ আর কতো হবে? প্রশাসনের নমনীয়তায় স্বশস্ত্র গোষ্টীগুলোর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
পাহাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের প্রত্যাশা করছে। তারা চায় সহিংসতা ও সংঘাতের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হোক।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হলো সংঘাত বন্ধ করা নয়, বরং ন্যায়বিচার, আস্থা এবং সহাবস্থানের ভিত্তি তৈরি করা।


















