সোমবার , ১৪ আগস্ট ২০২৩ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

আমার দেখা পাহাড়ের পদ্মা সেতু

প্রতিবেদক
ঞ্যোহ্লা মং
আগস্ট ১৪, ২০২৩ ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

যমুনা সেতু দেখেছি ২০০০ সালে। যমুনা সেতু উদ্বোধনের পরে, খুশিতে জোহা হলে বসে একটি লেখাও লিখেছিলাম। লেখার শেষে কাছের বন্ধু বিদ্যুৎকে পড়তে দিয়েছিলাম বলে আমার খুব মনে আছে।
যমুনা সেতু হওয়ার আগে ফেরি পার হতে গিয়ে মানুষের দুর্ভোগগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ফেরির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গর্ভবতী মাকে গাড়িতেই প্রস্রব করতে শুনেছি, পড়েছি।

মানুষ, মালবাহী ট্রাক,যাত্রিবাহী গাড়ির মধ্যে ফেরিতে উঠার প্রতিযোগিতাগুলোকে জীবনে ভুলার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করতে গিয়ে,গাড়িটি ফেরিতে উঠতে পারলে, সে যাত্রায় নিজেকে অনেকখানি হালকা লাগতো।

পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, রাজনীতি হয়েছে। সেই সেতুটিও আজ দেশের এক গর্বের প্রতীক। মাকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম স্বপ্নের পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়েছি। ঢাকা থেকে বের হয়ে পদ্মা সেতুর পথ ধরলেই মনে হবে যেন অন্যরকম এক বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছি। প্রশস্ত রাস্তা, রাস্তার মাঝখানে ফুল গাছ, রাস্তার দুধারে কাশফুল আর মুন্সিগঞ্জ এলাকায় ঐতিহ্যবাহী টিনের তৈরি দু’তলা ঘর- দারুণ লাগে।

আমাদের পাহাড়েও আছে একটি ‘পদ্মা সেতু’। পাহাড়ে সবচেয়ে বড় সেতু। এই সেতুটি দেখতে পাহাড়ের দূর দূরান্ত থেকে এখনো মানুষ ভিড় করে। প্রথম দিকে পদ্মা সেতুর ন্যায় মানুষগুলোকে হুড়মুড় খেয়ে নানিয়ারচর যেতে দেখেছি। রুমার ব্রীজ আর নানিয়ারচর ব্রীজ হবে হবে শুনতাম অনেক আগে থেকেই। রুমা ব্রীজের পিলার দেখেছিলাম ২০০৩ এরও আগে। এখন দুটি ব্রীজই অনেক মানুষের জন্য সেলফি জোন।
আমরা ৯২ ফোরামের কয়েকজন জিয়নের বাড়িতে বেড়ানোর পাশাপাশি সেতু দেখতে যাবো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। জিয়ন আমাদেরই একজন সহপাঠী।

দীর্ঘ বছর আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। সম্প্রতি জটিল বিন্দুর কল্যাণে তার সাথে আমাদের যোগসংযোগ হলো। যতদূর মনে পড়ে খুব সম্ভব ২০০৩-৪ এর দিকে বিপুলই আমাকে প্রথম জিয়নদের পাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল। জিয়নের সাথে বিপুলের একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। নতুন করে যোগাযোগ হওয়াই জটিল আর আমি জিয়নদের বাড়িতে বেড়ানোর পরিকল্পনা নিই। সেদিন আমরা বিন্দু ছাড়াও অংশুমান, প্রিয়তোষ, রুপম আর দেবর্ষি গিয়েছি। জিয়নদের গ্রামে প্রায়ই পৌঁছতে চলেছি। এমন সময় মোবাইলে দেবর্ষির সাথে যোগাযোগ হলে বলে, “আমিও যাব”। বন্ধুর টানে খাগড়াছড়ি থেকে সেও ছুটে আসে।

জিয়নকে মজা করে বলে রেখেছিলাম দেশী মুরগী মাংস খাওয়াতে হবে। তাই করেছে। পাহাড়িদের বাঁশ কুড়োল খাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু জিয়নদের বাড়িতে যে বাঁশকুড়োল খেয়েছি তা আজীবন মনে থাকবে। প্রথমে ভেবেছিলাম ঢাকায় থাকি তাই স্বাদ আমারই বুঝি বেশি লেগেছে।

ধারণাটি দেখি ঠিক নয়, জটিল, অংশুমান, রুপম, দেবর্ষি’রাও বাঁশকুড়োল নিয়েছে বারে বারে। আমরা সবাই একমত হলাম বাঁশকুড়োল পদের স্বাদটি ছিল অন্যরকম। বাঁশকুড়োলটি তার নিজের বাগান থেকে সংগ্রহ করা এবং বাঁশগুলো দেখতে উন্নত জাতের এবং পরিস্কার সুন্দর বলে মনে হয়েছে। তাই হয়তো আমাদের দারুণ আকৃষ্ট করেছে।
ছাত্রবেলার কথা শুরু হলে শেষ হতে চায় না। তারপরও জোর করে পাহাড়ের ‘পদ্মাসেতু’ দেখার টানে উঠতে হলো।
নানিয়ারচর বাজারের লঞ্চঘাটটি দেখেছি ৯৮-৯২ দিকে। বাজারে কখনো নামিনি। রাঙ্গামাটি যাওয়ার পথে নানিয়ারচর বাজারটি দেখতাম। সে সময়ে নানিয়ারচর পৌঁছতে পারলে ভাবতাম মহালছাড়ি আর বেশি দূরে নয়। অন্যদিকে বুড়িঘাট পৌঁছলে ভাবতাম রাঙ্গামাটি নিকটে। ছেলেবেলায় নদী পথ দিয়ে চোরাই কাঠের চালি কিভাবে নানিয়ারচর পাড়ি দিতো, সেসব ভয়ংকর, সাহসী কাঠ পাচারে সহায়তাকারী দিনমজুরদের থেকে অনেক গল্প শুনেছি। কাঠ একবার পার করে রাঙ্গামাটি পৌঁছে দিতে পারলে বুক পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে শ্রমিকরা গ্রামে ফিরতো, সে কথা খুব ভালোই মনে আছে। তখনতো আর বন, পরিবেশ, চোরাই পথে কাঠ ব্যবসা/পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি নিয়ে কোনো ধারনাই ছিল না। এখন বুঝতে পারি, পাহাড়ের রিজার্ভ বনের মহামূল্যবান কাঠগুলো কিভাবে, কি পন্থায় পাচার হয়েছে, আমাদের বনগুলোকে কিভাবে, কারাই বা ধ্বংস করে দিয়েছে।
লঞ্চের যুগে নানিয়ারচর বলতে স্মৃতিতে লঞ্চঘাট পর্যন্তই। সড়ক পথ চালু হলে নানিয়ারচর রাস্তার মুখটাই চিনতাম। কখনো সেই পথে যাইনি। ফলে সেতু দেখতে গিয়ে নানিয়ারচর প্রবেশ মুখ থেকে যা দেখেছি সবই আমাকে হতবাক করেছে। যা দেখেছি, তেমনটি দেখবো এমন চিন্তা করে রাখিনি। রাস্তার দু ধারে ঘরবাড়ি, দালান, বাজার দেখে আমি বুঝতে পারলাম, আমার দেখা নানিয়ারচর আর এই নানিয়ারচরের কত ব্যবধান! ব্রীজে পৌঁছার আগে পর্যন্ত পাহাড়ে উঠেছি আর নেমেছি। রাস্তাটি যতনা সুন্দর, পথের দুধারে বন কেটে আনারসের বাগান আর এর গতিপ্রকৃতি নিয়ে আমাকে ভাবিয়েছে। আনারসের কাঁটা থাকলেও আমরা আনারসের প্রেমে ডুবে গিয়েছি কিনা ভেবেছি।
পাহাড়ের জুমচাষিরা হাতের ছোট দা দিয়ে গর্ত করে বীজ বপন করে। মাটি কোদাল দিয়েও কাটে না। তারপরও আমরা “বিশেষভাবে জ্ঞানীরা” জুমকে দেখতে পারি না। জুম দেখলে বন, পরিবেশ, জলবায়ুর কথা মনে পড়ে। সকল দোষ জুমচাষিদের ওপর দিয়ে তবেই শান্তি পাই। অন্যদিকে আনারসচাষিরা পাহাড় কেটে মাটিকে আনারস চাষে উপযোগী করে তোলে। একই জায়গায় প্রতিবছর আনারস চাষ করতে গিয়ে প্রতিবছর মাটি কাটে, পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে, মাটি কোদাল দিয়ে কাটার ফলে ঝরা মাটিসব নিচের দিকে চলে যায় । তারপরও আনারসের কাঁটাকে প্রেম কাঁটায় পরিণত করছি, ভাবছি আর ভালোবাসতে শুরু করেছি।
আনারসের বাগান সীমিত করা না গেলে সাজানো নানিয়াচরের প্রবেশ পথটির দুপার ভেঙ্গে পড়তে শুরু করবে। রাস্তা ভেঙ্গে পড়া ঠেকাতে বছরে বছরে বাজেট, পরিকল্পনা হতেই থাকবে।

সে যাই হোক, সেতুতে পৌঁছে দেখি, সেতুটা যেন এক কঙ্কাল, পানি নেই। ব্রীজের নিচে বিস্তীর্ণ এলাকা  এখন গরু আর কিছু রাখালের দখলে। বিস্তীর্ণ চাষযোগ্য জমি দেখে বুঝতে পারলাম, উপজেলাটির নাম নানিয়ারচর হলো কেন। ব্রীজের গোড়ায় পেয়েছি ‌’আই লাভ নানিয়ারচর’ লেখা সেলফি জোন। সবাই ছবি তুলছে। আমি যে নানিয়ারচর দেখেছি, সে নানিয়ারচর নয়। তখন পানি ছিল। লঞ্চ চলতো। এখন লঞ্চের বদলে গরু আর রাখালই দেখলাম।
বন্ধুরা ‘আই লাভ নানিয়ারচর’ লেখা আছে জায়গায় গিয়ে ছবি তুললো, আমিও তুললাম। মনে মনে ভাবলাম, এ কেমন ভালোবাসা। ভালোবাসবো যদি, তবে কেন, ইংরেজিতেই ভালোবাসতে হবে? আমরা কি সত্যিই নানিয়ারচরকে ভালোবাসি, দেশকে ভালোবাসি? ইংরেজিতে না লিখে বাংলায় একই স্টাইলে লাল রঙে লিখলে কি কেউ ছবি তুলতো না? কবে একবার ২১শে ফেব্রেুয়ারি আসবে, তবেই, ভালোবাসা দেখাবো? সংখ্যাগরিষ্ঠরা বাংলাকে ভালোবাসতে না পারলে, তারা কি করে পাহাড়ের ভাষাগুলোকে ভালোবাসা দেখাবে?
এটি শুধু নানিয়ারচরে নয়, পাহাড়ের অনেক উপজেলায় ইংরেজিতে “অমুক উপজেলাকে, স্থানটিকে ভালোবাসি” বলে ঝুলানো হয়েছে। সেটি ঝুলানোতে কিছু পর্যটক ছবি তুলছে বটে, তবে আদৌ কি এর দ্বারা কোনো ভালোবাসার প্রকাশ ঘটছে? পাহাড়ে পর্যটক প্রবেশের নানা বিধি নিষেধের কারণে বর্তমানে শতভাগই দেশীয় পর্যটক আর তাদের জন্য কেন কষ্ট করে ইংরেজিতে লিখতে হবে?

নানিয়ারচর ব্রীজের ওপরে ছবি তুলতে তুলতেই ঠিক হলো, নানিয়ারচর বাজার এলাকায় বাস করা এক সহপাঠীনিকে খুঁজে বের করবো। অল্প সময়ে আমাদের দেখা হয়ে গেলো প্রভা রাণী দে’র সাথে। এক সাথে স্কুলে পড়েছি। মাঝখানে ৩০-৩১ বছর বাদে দেখা হলো আমাদের। প্রভার তিন মেয়ে এক ছেলে। দুই মেয়ে চাকরি ধরেছে। তার বাড়িটি একেবারে নদীটির পাড়ে। ভরা বর্ষা মৌসুমে, ভালো সময়ে তার বাড়ির বারান্দায় বসলে মনে হবে কক্সবাজারে বসে আছি।
প্রভার থেকেই জেনেছি ব্রীজের ওপারে আমাদের আরেক সহপাঠীনি থাকে। সময় স্বল্পতার কারণে তার কাছে পৌঁছতে পারিনি। তার সাথে দেখা করতে হলে রাস্তা পেরিয়ে আরো কিছুদূর হাঁটতে হতো। অন্য কোনোদিন বাকি বন্ধুরা রত্না চাকমাকে খুঁজে বের করবে বলে বিশ্বাস রাখছি।
আগেই জানতাম, পাহাড়ের পদ্মা সেতুটি একজন পাহাড়ের গুণী মানুষের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এটি পাহাড়ের ‘পদ্মা সেতু’র একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমরা দেরিতে হলেও স্থানীয় গুণীদের স্মরণ করতে ভুল করিনি। চুনিলাল দেওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও আমাদের জ্ঞান চর্চার ধরণ আর প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির প্রভাবে তরুণদের মাঝে তিনি অপরিচিত থাকবেন বলতে পারি। তারপরও পাহাড়ের বড় সেতুটি তাঁর নামে নামকরণ হওয়াই নামটি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকলো নানাভাবে, নানা পন্থায়। পাহাড় প্রশ্নে সরকারের একটি সুন্দর সিদ্ধান্তের এক অনন্য উদাহরণও হয়ে থাকলো। পাশাপাশি শঙ্খ নদীর ওপর ইতিমধ্যে ৬টি বড় সেতু নির্মিত হয়েছে বলে জানি। রুমা উপজেলার সেতুটিও ইউ কে চিং বীর বিক্রমের নামে নামকরণ করার সুযোগ রয়েছে।

ঞ্যোহ্লা মং, কলাম লেখক। ইমেইল:nyohlamong2@gmail.com

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত
%d bloggers like this: