রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাচালং বাজার থেকে লাইল্যাঘোনা পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নির্ধারিত মান বজায় না রেখে তড়িঘড়ি কাজ শেষ করার চেষ্টা এবং প্রকল্প এলাকায় কোনো তথ্যফলক না থাকার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। একইসঙ্গে সরেজমিনে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নুর উদ্দীন রাজুর বিরুদ্ধে। প্রকল্পটি “GOV Maintenance” কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মেসার্স আয়ান এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবে করছেন বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মাবুদ এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য আতাউর রহমান।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় সড়কের গার্ডওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার না করে দায়সারা কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। গার্ডওয়ালের ইট হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে গার্ডওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, যা মানসম্মত নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কার্পেটিংয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী যেখানে ১৫ মিলিমিটার পুরুত্ব থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে ৭ থেকে ৮ মিলিমিটার কার্পেটিং দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কার্পেটিংয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার তিন থেকে চার দিন পর হাত দিয়ে টান দিলেই তা উঠে যাচ্ছে, যা কাজের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।এছাড়া প্রকল্পের কাজ চলাকালে কোনো সতর্কতামূলক বা কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ডও দেখা যায়নি। রাস্তার উপরের বালু ও ময়লা যথাযথভাবে অপসারণ না করেই তার ওপর বিটুমিন ঢেলে দ্রুত কাজ শেষ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সড়কটির টেকসই অবস্থা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এভাবে কাজ হলে বর্ষায় আবার গর্ত হবে, কার্পেটিং উঠে যাবে। শেষ পর্যন্ত ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকেই।”

এদিকে কাজ চলাকালে Local Government Engineering Department (এলজিইডি)-এর কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে সরেজমিনে দেখা যায়নি। তঅবে ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মোঃ কামরুল-এর সঙ্গে কথা বলে প্রকল্পের কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তার কাছে কোনো ইস্টিমেট কপি পাওয়া যায়নি। তিনি দাবি করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে এবং কোনো অনিয়ম নেই। তবে অভিযোগের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হলে তিনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন আব্দুল মাবুদের ভাগিনা, বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নুর উদ্দীন রাজু। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে উল্টো প্রশ্ন তোলেন— “এখানে কী সমস্যা হয়েছে? এটা কি আপনাদের এলাকা? আপনারা কে? আপনারা কি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার নাকি থানা ইঞ্জিনিয়ার?” তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে আর কথা বললে আমার চোখের পর্দা উল্টে গেলে তখন অনেক সমস্যা হয়ে যাবে।”
সাংবাদিকদের অভিযোগ, তিনি অশোভন আচরণ ও হুমকিমূলক বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের ‘চাঁদাবাজি’ করতে আসার অভিযোগ তোলেন। এমনকি উপস্থিত শ্রমিকদেরও ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রশ্ন তুললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন বলে দাবি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পটির কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্বে থাকায় এবং রাজনৈতিক প্রভাব থাকার কারণে আব্দুল মাবুদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলতে অনেকেই সাহস পাচ্ছেন না।
সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ বুঝে নেওয়ার পরই বিল প্রদান করা হবে। কাজে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে ঠিকাদারের লাইসেন্স কালো তালিকাভুক্ত করা হবে এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে।”
অন্যদিকে উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. সাজু আহমেদের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “আপনি পিচের ওপর ডিজেল ঢেলে খোঁচা দিয়েছেন, তাই উঠে গেছে। আপনারা আগেই ইট তুলে পরে ভিডিও করে বলছেন যে হাত দিয়ে টান দিলে ইট উঠে যাচ্ছে।”
এর জবাবে প্রতিবেদক তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি ঠিকাদারের পক্ষ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয়কে সমর্থন করছেন কিনা। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট জবাব না দিয়ে উল্টো প্রতিবেদককে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন এবং কোনো তথ্য দিতে অপারগতা জানান। পরবর্তীতে তিনি ফোন কেটে দেন। পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, কাজের গুণগত মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।


















