সোমবার , ২৮ আগস্ট ২০২৩ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
  1. জাতীয়
  2. রাঙামাটি
  3. খাগড়াছড়ি
  4. বান্দরবান
  5. পর্যটন
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. রাজনীতি
  8. অর্থনীতি
  9. এনজিও
  10. উন্নয়ন খবর
  11. আইন ও অপরাধ
  12. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  13. চাকরির খবর-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি
  14. অন্যান্য
  15. কৃষি ও প্রকৃতি
  16. প্রযুক্তি বিশ্ব
  17. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি
  18. শিক্ষাঙ্গন
  19. লাইফ স্টাইল
  20. সাহিত্য
  21. খোলা জানালা

“পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ কার্যকর” রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ উত্থাপনে পাহাড়ে উদ্বেগ

প্রতিবেদক
হিমেল চাকমা, রাঙামাটি
আগস্ট ২৮, ২০২৩ ২:৫৮ অপরাহ্ণ

চিটাগং হিল ট্র্যাক্ট (পার্বত্য চট্টগ্রাম) রেগুলেশন ১৯০০ এখনো কার্যকর একটি আইন। এ রেগুলেশনটির   কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ২০১৪ সালে   ও ২০১৬ সালে  পৃথক দুই মামলার রায় দেন সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের পুর্ণ বেঞ্চ। কিন্তু এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে সুপ্রীম কোর্টে রিভিউ করেছেন মোহাম্মদ আব্দুর মালেক ও আব্দুল আজিজ আখন্দ নামে খাগড়াছড়ির দুই বাসিন্দা।

আইনজ্ঞরা বলছেন, এ রিভিউ রাষ্ট্রের রায়ের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। সে হিসেবে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা বিজ্ঞ এটর্নী জেনারেল রিভিউকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান থাকার কথা। কিন্তু তিনি তা না করে বরং রিভিউকে সমর্থন করে রায়ে থাকা ” রাজা, ইনডিজিনাস শব্দ সহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাদ দিয়ে হলফনামা আকারে সুপ্রীম কোর্টে দাখিল করেছেন। যা এক প্রকার রাষ্ট্রের  রায়ের বিরোধীতার সামিল।

বিজ্ঞ এটর্নী জেনারেলের এমন ভূমিকায় উদ্বিগ্ন পাহাড়ের মানুষ। এ রিভিউ  পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী ও স্থায়ী বাসীন্দাদের নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন তারা। এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য তিন পার্বত্য (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) জেলার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিশিষ্টজনেরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গত ১৬ জুলাই স্মারকলিপিও দিয়েছেন।

জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত স্থায়ী ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের সুরক্ষার জন্য বৃটিশ সরকার ১৯০০ সালে একটি আইন প্রনয়ন করে। যে আইনটি চিটাগং হিল ট্র্যাক্ট রেগুলেশন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ নামে পরিচিত। এ রেগুলেশনটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সকল অধিকারের সুরক্ষা দিয়ে আসছে। এ রেগুলেশনের সাথে সঙ্গতি রেখে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হয়।

চুক্তির আলোকে তিন পার্বত্য (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয় সৃষ্টি হয়।

রেগুলেশন মতে, তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক

পদাধিকার বলে সিভিল জজ হিসেবে দেওয়ানী বিচারিক

কার্যক্রম এবং বিভাগীয় কমিশনার পদাধিকার বলে জেলা ও

দায়রা জজ এবং দেওয়ানী মামলার আপীল কর্তৃপক্ষ ও

ফৌজদারী বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

২০০৩ সালে এ রেগুলেশনের শুধুমাত্র এ দুটি সংশোধনী

এনে দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচার কার্যক্রম বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা ও দায়রা জজের আদালতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ সংশোধনীতে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি পাহাড়ের মানুষ বরং ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছিল।

সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে রাঙামাটি ফুডস প্রোডাক্ট লি.

এক মামলায় হাইকোর্ট বেঞ্চ সিএইচটি রেগুলেশনকে ডেড ল

বা মৃত আইন বলে রায় দেয়। এ রায়ের ফলে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি, পার্বত্য জেলা

পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদসহ এবং সিএইচটি রেগুলেশনের সৃষ্ট

প্রথাগত প্রতিষ্ঠানসমূহ সংকটের মুখে পড়ে।

এ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা হলে সুপ্রীমকোর্ট আপীল বিভাগের পূর্ণ বেঞ্চ   ২০১৬ সালে ২২ নভেম্বর সিএইচটি  রেগুলেশনকে একটি কার্যকর ও বৈধ আইন বলে রায় দেয়। অন্যদিকে সুপ্রীম কোর্টে বিচারধীন ওয়াগ্গা ছড়া টি স্টেট অপর এক মামলার ২০১৪ সালে ২ ডিসেম্বর রায় দেয়।

এ দুটি রায়ই সিএইচটি  রেগুলেশনকে জীবিত আইন বলে রায় দেয়। উক্ত দুটি রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে সুপ্রীম কোর্টে

রিভিউ আবেদন করেন খাগড়াছড়ির দুই বাঙালী বাসিন্দা।

বিজ্ঞ এটর্নী জেনারেল উল্লেখিত দুজনের রিভিউ আবেদন গ্রহণ করে রিভিউর পক্ষে অবস্থান নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের দুটি রায়ে থাকা রাজা, ইনডিজিনাস শব্দসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাদ দিয়ে হলফনামা আকারে সুপ্রীম কোর্টে দাখিল করেন। এ রিভিউ সুপ্রিম কোর্ট আপীল বিভাগের বেঞ্চ  গ্রহণ  করবে কিনা তার উপর শুনানী হবে আগামী ১৯ অক্টোবর।

এ বিষয়ে চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, সিএইচটি রেগুলেশনকে যখন মৃত আইন বলে রায় দেয়া হয়েছিল। এ রায়ের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার আপীল করেছিল। এ আপীলে রেগুলেশনটি জীবিত আইন হিসেবে রায় পায়।

যেহেতু এটর্নী জেনারেল সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা সেহেতু এ রায়ের বিরুদ্ধে যারা রিভিউ চেয়েছে তাদের বিপক্ষে তাঁর অবস্থান থাকার কথা। কিন্তু তিনি তা না করে রিভিউকে সমর্থন করে রায়ের

গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাদ দিয়ে হলফনামা

আকারে সুপ্রীম কোর্টে দাখিল করেছেন।

এটা এক প্রকার সরকারের পক্ষের রায়ের বিরোধীতা করার মত।

তাছাড়া পার্বত্য মন্ত্রনালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ তো সরকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান সিএইচটি রেগুলেশন অনুসরণ করে। সেহেতু এটর্নী জেনারেলের উচিত ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করা। কিন্তু তিনি কোন আলোচনা না করে রেগুলেশনের  গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাদ দিতে সুপ্রীম কোর্টে প্রার্থনা করেছেন।

রাঙামাটির সিনিয়র আইনজীবী এড রাজীব চাকমা বলেন, এটি একটি সম্পুর্ণ নিষ্পত্তির বিষয়।

একমাত্র মৃত্যুদন্ড রায় ছাড়া এ ধরণের রিভিউ খুব কমই দেখা যায়। শুধুমাত্র আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে রিভিউ দেখেছি।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি  অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, সিএইচটি রেগুলেশন যুগ যুগ ধরে অনুসরণ করে আসছে পাহাড়িরা। এ রেগুলেশনের সাথে সংগতি রেখে পার্বত্য চুক্তি হয়েছে।

এ চুক্তিকে রাজা, হেডম্যান, কার্বারীসহ ইত্যাদি স্বীকৃত।  এখন এসব শব্দসহ গুরুত্বপুর্ণ বিষয়গুলো বাতিল করা হলে তো রেগুলেশনটি না থাকার সমান।

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এড মামুনুর রশীদ বলেন, সিএইচটি রেগুলেশনকে আমরা শ্রদ্ধা করি এবং মেনে চলে আসছি। এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা করে আসছে। আইনটির বয়স ১২৩ বছর হয়ে গেল। বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পাহাড়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আইনটি সেভাবে রয়ে গেছে। যদি এটি সংশোধনের প্রয়োজন মনে করা হয় তার আগে অবশ্যই পাহাড়ের বিজ্ঞ জনদের মতামত নিতে হবে। নেয়া না হলে বির্তক তৈরি হবে।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মনিরুজ্জামান মহসিন বলেন, পাহাড়ের স্বকীয়তা, বৈশিষ্ট্য অটুট রাখতে এ আইনটি খুবই প্রয়োজন। পাহাড়ি মানুষ মামলাবাজ না। এরা মামলায় জড়াতে চায়না। সেজন্য রেগুলেশনটি দরকার। তাঁরা খুব সামান্যতে তুষ্ট থাকে। পাহাড়ে স্থায়ী পাহাড়ি বাঙালীরা এ রেগুলেশন নিয়ে প্রশ্ন তুলে না। কিন্তু বাইরের থেকে বসতি গড়া মানুষেরা এ আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি আমাদের বাপ দাদারা মেনে চলেছেন। আমরাও মেনে চলি। ভবিষ্যতেও চাই এ আইনটি যেন বেঁচে থাকুক। সরকারী কর্মকর্তা যাঁরা পাহাড়ের দায়িত্ব পালন করতে আসে তাঁদের বলি এ আইনটি পড়তে। এ আইনটি পার্বত্য চট্টগ্রামকে সুরক্ষা করেছে।

রাঙামাটির সমাজ সেবক ও জেলা স্কাউটের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছার বলেন, আইনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বকীয়তা, বন ও ভূমি রক্ষা, ঐতিহ্যগত জনগোষ্ঠী সুরক্ষায় সুন্দর একটি আইন। এ আইনটি আমার বাপ দাদারা মেনে চলে এসেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বকীয়তা বজায় রাখতে এই আইনটি থাকা দরকার। এ রেগুলেশনটি যেন আরো শক্তিশালী হয়, পার্বত্য চট্টগামের বন ভূমি ঐতিহ্যগত জনগোষ্ঠীদের সুরক্ষার জন্য সেজন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, সিএইচটি রেগুলেশন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষা কবচ।

এটি নিয়ে পাহাড়িদের কোন বিতর্ক বা দ্বিমত নেই। কিন্তু এ আইনের মূল বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে ষড়যন্ত্রের আলামত দেখা যায়।

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, এ রেগুলেশনের উপর হাত দেওয়া মানে হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের উপর হাত দেওয়ার সামিল। একটি অংশ আমাদের একেবারে নি:চিহ্ন করতে চায় তা এর প্রমাণ।

নিষ্পত্তি হওয়া একটি রায়ের উপর রিভিউর জন্য সুপ্রীমকোর্টে ঘুরে ঘুরে কার্য তালিকায় রাখা হচ্ছে তাও আবার এ সরকারের আমলে এটি আমরা সন্দেহ করছি সরকার বা বর্তমান প্রধান বিচারপতির পরিবর্তন ঘটলে এ রায়কে অকার্যকরের ষড়যন্ত্র করা হবে।

সেটি যেন না হয় সেজন্য আমরা তিন পার্বত্য জেলার বিশিষ্টজনদের স্বাক্ষর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন,  সিএইচটি রেগুলেশন নিয়ে সুপ্রীম কোর্ট যে রায় দিয়েছে শুরু থেকে আমি এই রায়ের পক্ষে কথা বলে আসছি। এ রায়ের বিরুদ্ধে যে রিভিউ চাওয়া হয়েছে এ রিভিউ মঞ্জুর হলে বিভিন্ন ভাবে আদিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিং বলেন, সিএইচটি রেগুলেশনের উপর তো পার্বত্য চুক্তি। এটি পরিবর্তন করতে হলে তো স্থানীয় জনগণের সাথে আলোচনা করে করতে হবে

সর্বশেষ - আইন ও অপরাধ

%d bloggers like this: