জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাঙামাটির বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনরা। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাঙামাটিতে ‘সৌরবিদ্যুৎ বিষয়ে জনসাধারণের জ্ঞান ও ধারণা’ জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ‘রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (FED) রাঙামাটি, জাবারাং কল্যাণ সমিতি, কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (CLEAN) এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BWGED) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সভায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় ‘ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সুযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি নীতিপত্র (পলিসি ব্রিফ) উপস্থাপন করেন জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।
নীতিপত্রে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং এ খাতের সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়। আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখনও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিপুল অব্যবহৃত ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
বাড়িঘর, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ কাজে লাগানো গেলে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব বলেও মত দেন বক্তারা। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ শুধু একটি বিকল্প বিদ্যুৎ উৎস নয়, এটি জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাঙামাটি পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের প্রতিটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তিনি সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে যার যার অবস্থান থেকে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (FED) রাঙামাটির সাধারণ সম্পাদক নুকু চাকমার সঞ্চালনায় এবং সদস্য ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিশির চাকমার সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক দুই সদস্য, রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বাঞ্চিতা চাকমা ও রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নিরূপা দেওয়ান।
বক্তারা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উপযোগী ভবন ও স্থাপনা চিহ্নিতকরণ, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় থেকেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও ভূমিকা রাখবে বলে মত দেন তারা।
সভায় ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা ও সংকট মোকাবিলা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত, আর্থিক, কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়।


















